হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন-তেহরান পাল্টা-পাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন-তেহরান পাল্টা-পাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ঢাকা: কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘অ্যাপাচি’ সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরান এবার বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) সদর দফতরসহ কুয়েত ও জর্ডানের একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সমন্বিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টা-পাল্টি হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি এএইচ-৬৪ (AH-64) অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে। ওয়াশিংটনের দাবি, আকাশসীমায় টহলরত হেলিকপ্টারটিকে ইরানের একটি সশস্ত্র ‘শাহেদ’ ড্রোন আঘাত করে ভূপাতিত করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ভূপাতিত হেলিকপ্টারের দুই পাইলটকে বিশেষ ‘সি ড্রোন’ বা চালকবিহীন জলযানের মাধ্যমে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই ঘটনাকে মার্কিন সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে মার্কিন প্রশাসন তাৎক্ষণিক পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের নির্দেশে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চল জাস্ক, সিরিক এবং কেশম দ্বীপের বেশ কয়েকটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার স্টেশন লক্ষ্য করে তিন দফায় বিমান হামলা চালায়। মার্কিন প্রশাসন এই অভিযানকে একটি ‘আনুপাতিক ও সীমিত আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দেয়। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই মার্কিন হামলায় দেশটির উপকূলীয় অঞ্চলের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সিরিক জেলার দুটি প্রধান পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে।

মার্কিন বিমান হামলার পরপরই ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যৌথভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামোগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক পাল্টা আঘাত শুরু করে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা বাহরাইনের মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কার্যালয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে কুয়েতের আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি এবং জর্ডানের আল-আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে যৌথ হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের দাবি, এসব হামলায় মার্কিন বাহিনীর এফ-৩৫ ফাইটার জেটের হ্যাঙ্গার এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এদিকে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরানের ছোঁড়া অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আকাশেই প্রতিহত বা ধ্বংস করা হয়েছে এবং এই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীও তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ৫টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার কথা নিশ্চিত করেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বেসামরিক নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিকটবর্তী নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের জাতীয় সংকল্প পরীক্ষা করার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো ধরনের বৈদেশিক আগ্রাসন বা হুমকি অনুত্তরিত রাখবে না। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা এই অঞ্চলে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ না চাইলেও নিজেদের সুরক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুটে এই সামরিক সংঘাত বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ