ভেনেজুয়েলায় জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্প, দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি

ভেনেজুয়েলায় জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্প, দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভয়াবহ ও শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ভবন ধসের আশঙ্কার মধ্যে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং উদ্ধার তৎপরতা বেগবান করতে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাতালরেল ও রেলযোগাযোগ। একই সঙ্গে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে নাগরিকদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডকে মাঠে নামানো হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন বা ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির এই ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি জানান, ভূমিকম্পের আঘাতে বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় রাজধানী কারাকাসের কাছে মাইকেতিয়ায় অবস্থিত সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। বিমানবন্দরটির বেশ কিছু স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে দেশের সমস্ত স্কুল-কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। গণপরিবহন ব্যবস্থা সচল থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও উদ্ধারকার্যে বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় পাতালরেল এবং সাধারণ রেলসেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য বাণিজ্যিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। ডেলসি রদ্রিগেজ আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফকে জরুরি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সমগ্র উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে থাকবে বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার জেনারেল।

এদিকে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেয়ো জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। অনেক এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে এবং উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে প্রশাসন নিরলস কাজ করছে। দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই দুর্যোগের সময়ে শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সতর্ক অবলম্বন করতে হবে। একে অপরের খোঁজখবর রেখে ধৈর্য ও ঐক্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী কারাকাসের আলতামিরা অঞ্চলের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এই এলাকায় বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে এবং বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জরুরি উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসাকর্মীরা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেন, সেজন্য সাধারণ চালকদের রাস্তা ফাঁকা রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা নিয়ে একটি প্রাথমিক পূর্বাভাস জারি করেছে। সংস্থাটির মডেল অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা এই শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। ইউএসজিএসের হিসাব মতে, প্রাণহানি ১০ হাজার ছাড়ানোর সম্ভাবনা ৪৪ শতাংশ এবং তা ১ লাখের ওপর চলে যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের গভীরতা কম থাকায় এর ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাব অত্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট হতাহতের সংখ্যা বা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

ইউএসজিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘সিসমিক ডাবলেট’ বা জোড়া ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করছেন। প্রথম ভূকম্পনটি আঘাত হানে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর রাজধানী থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও একটি শক্তিশালী এবং প্রধান ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভূগর্ভের স্বল্প গভীরতায় এই জোড়া কম্পন সৃষ্টি হওয়ায় রাজধানী কারাকাসসহ সমগ্র ভেনেজুয়েলাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে। উদ্ধারকারী দলগুলো বর্তমানে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ