আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ দ্রুত ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি তামিলনাড়ু অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। শনিবার সকালে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি তখন কারাইকাল উপকূল থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল এবং উত্তর তামিলনাড়ু ও দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার ভোরের আগে এটি তীরে আছড়ে পড়তে পারে।
ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’র প্রভাবে ভারতের পাশাপাশি প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায় ইতিমধ্যে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। সরকারি হিসেবে, এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং প্রায় ২০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। কয়েক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়ে অবস্থান করছেন। বহু এলাকায় বাড়িঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও অন্যান্য উঁচু অবকাঠামোর ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। উদ্ধারকর্মীরা নৌযান ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে দুর্গতদের উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানায়, ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রচণ্ড বর্ষণে পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ায় আকস্মিক ধসের ঘটনা বারবার ঘটছে। এতে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ফলে উদ্ধার অভিযান আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ভারতের তামিলনাড়ুতে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় রাজ্য সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। উপকূলীয় এলাকায় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল, দমকলকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সমন্বয়ে জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে তামিলনাড়ুর দক্ষিণাঞ্চলসহ আশপাশের এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সমুদ্র উপকূলের বিভিন্ন অংশে জলোচ্ছ্বাস দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। সমুদ্রের ওপর দিয়ে ঝড়ো বাতাস বয়ে যাওয়ায় রাজ্যের বেশ কয়েকটি স্থানে নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। উপকূলে মাছ ধরতে যাওয়া নৌকা ও জাহাজগুলোকে আগেই নিরাপদ স্থানে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তামিলনাড়ুর অভ্যন্তরীণ পরিবহন এবং আকাশপথে চলাচলেও প্রভাব পড়েছে। সতর্কতার অংশ হিসেবে রাজ্যের বেশ কয়েকটি নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি, রেল যোগাযোগেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার রাতে রামআশ্রম–ওখা এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়, কারণ ঝড়ো হাওয়া পাম্বন ব্রিজ এলাকায় চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থান করলেও ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’র বড় ধরনের প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার আশঙ্কা নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। দেশের উপকূলীয় এলাকায় সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও ঘূর্ণিঝড়টির মূল আঘাত ভারতের তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে সীমাবদ্ধ থাকবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, ঝড়টি বাংলাদেশের দিকে না আসায় দেশের উপকূলীয় মানুষদের বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে সতর্কতা জারি করার প্রস্তুতি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ আঘাত হানলে তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষি, অবকাঠামো ও জনজীবনে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। ভারী বর্ষণে ফসলের ক্ষতি, বিদ্যুৎ বিপর্যয়, সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়া এবং আশ্রয়হীন মানুষের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া দুর্যোগ–পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠন কাজে বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগে প্রবেশের পর ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তা ও সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।


