রাশিয়ার দু’টি ট্যাংকারে ইউক্রেনের নাভাল ড্রোন হামলা

রাশিয়ার দু’টি ট্যাংকারে ইউক্রেনের নাভাল ড্রোন হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে নাভাল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনের নৌবাহিনী। গতকাল সাগরপথে চলাচলের সময় ‘কাইরোস’ ও ‘ভিরাট’ নামের জাহাজ দুটি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউক্রেনীয় নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে জানান, বিস্ফোরকবাহী চালকবিহীন নৌযান ব্যবহার করে এ হামলা পরিচালনা করা হয়।

ইউক্রেনীয় ওই কর্মকর্তা জানান, রাশিয়া জ্বালানি তেল রপ্তানির মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থ সংস্থান করছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ট্যাংকার দুটিকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কর্মকর্তা আরও বলেন, হামলার দৃশ্য ধারণ করা ভিডিও পর্যালোচনার ভিত্তিতে জাহাজ দুটির গুরুতর ক্ষতি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং সেগুলো আর চলাচলের উপযোগী নয়।

নাভাল ড্রোন হলো চালকবিহীন একটি বিস্ফোরকবাহী নৌযান, যা সাধারণত সাগরে যুদ্ধজাহাজ বা গুরুত্বপূর্ণ নৌযানে হামলার জন্য ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই নৌ-ড্রোনকে তাদের কৌশলের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে সামুদ্রিক রুটগুলোকে নিরাপদ রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা যায়, হামলার সময় কাইরোস ও ভিরাট ট্যাংকার দুটি খালি ছিল। জাহাজ দুটি কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী নভোঅরাসিয়াস্ক বন্দর এলাকায় তেল বোঝাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল। যাত্রাপথেই ড্রোনের আঘাতে জাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের পর একাধিক স্থানে ট্যাংকারগুলোর কাঠামোতে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে সেগুলোর পুনরায় ব্যবহারের সম্ভাবনা খুবই কম।

ট্যাংকার কাইরোস ও ভিরাট— উভয়টির নাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, এসব জাহাজ রাশিয়ার তেল রপ্তানির বিকল্প নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা হতো। ইউক্রেনের সাম্প্রতিক নৌ-অভিযানকে তারা রাশিয়ার তেল সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।

হামলার পর তুরস্কের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, জাহাজ দুটির ক্রুদের নিরাপদে উদ্ধার করে তুর্কি কোস্টগার্ডের মাধ্যমে তীরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তুরস্ক আরও জানায়, কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল রুটে এ ধরনের ড্রোন হামলা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাগরপথে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা হামলা ও সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তুরস্কের উদ্বেগের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ কাজাখস্তানও এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, কৃষ্ণ সাগর দিয়ে তাদের তেল রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবহন করা হয়। তাই এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষ্ণ সাগরবেষ্টিত দেশগুলো ইতোমধ্যে সাধারণ বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে সামুদ্রিক সংঘাতের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে রাশিয়া বিভিন্ন বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে। তবে নৌ-ড্রোন হামলা ঘন ঘন বাড়তে থাকলে রাশিয়ার তেল পরিবহন খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ঘটনাকে ঘিরে মস্কোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া বলেছে, কৃষ্ণ সাগরে ইউক্রেনের নৌ-ড্রোন কার্যক্রম তাদের বাণিজ্যিক নৌযান এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। ইউক্রেন অন্যদিকে বলে আসছে, রাশিয়ার যুদ্ধঅর্থনীতি দুর্বল করতে তাদের নৌবাহিনী বেসামরিক অবকাঠামো নয়, বরং যুদ্ধসম্পর্কিত তেল পরিবহন ব্যবস্থাকেই লক্ষ্য করছে।

সামগ্রিকভাবে, কৃষ্ণ সাগরে এ হামলা চলমান যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য রুট, জ্বালানি সরবরাহ, এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এর ফলে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এই সাগরপথ ইউরোপ ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ