জাতীয় ডেস্ক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তিন দফা দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে টানা কর্মবিরতি পালন করে আসছেন, যার ফলে দেশের সাড়ে ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। আগামী সোমবার শুরু হওয়ার কথা থাকা বার্ষিক পরীক্ষা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণে সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিলে তারা পরীক্ষায় অংশ নেবেন না, ফলে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় স্থবিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন স্কেল উন্নীতকরণ, উচ্চতর গ্রেড সমস্যা সমাধান এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের দাবি কার্যকর করার বিষয়ে নির্দিষ্ট অগ্রগতি না হওয়ায় কয়েক দফা কর্মসূচি শেষে আবারও তারা কর্মবিরতিতে ফিরে যান। চলমান কর্মসূচির ফলে বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকলেও পাঠদান না হওয়ায় শিক্ষাকার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষক পরিষদের অন্যতম আহ্বায়ক মু. মাহবুবর রহমান জানান, শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রেড বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকরা শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করলেও তাদের বেতন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, রোববার রাতের মধ্যে দাবি পূরণে কোনো কার্যকর ঘোষণা না এলে সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া বার্ষিক পরীক্ষা বহাল রাখার সুযোগ থাকবে না এবং তারা তা বর্জন করতে বাধ্য হবেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে জানা যায়, দেশে মোট ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে এবং এখানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা তিন লাখ ৮৪ হাজারের বেশি। কয়েক বছর আগে প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল দশম গ্রেডে উন্নীত করা হলেও সহকারী শিক্ষকরা এখনও ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন। এ কারণে দুই পদে গ্রেড ব্যবধান এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই পদের শিক্ষকরা বেতন ও পদোন্নতির দিক থেকে বৈষম্যের শিকার হওয়ায় কর্মপরিবেশে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা সমাধান না হলে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কর্মবিরতির আগে শিক্ষকরা গত ৮ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ওই কর্মসূচির সময় পুলিশ ও শিক্ষকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে দেড় শতাধিক শিক্ষক আহত হন। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের আশ্বাস পাওয়ার পর তারা কর্মস্থলে ফিরে গেলেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পুনরায় কর্মবিরতিতে যোগ দেন।
ডিপিইর মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান গত ২৭ নভেম্বর আন্দোলনরত শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন না করার আহ্বান জানান। তিনি জানান, দাবি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি হচ্ছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। তবে শিক্ষক নেতারা বলেন, সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন না।
চলমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পাঠদান বন্ধ থাকায় বার্ষিক পরীক্ষার আগে প্রস্তুতিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছে, যা অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন, কারণ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি—বেতন স্কেল দশম গ্রেডে উন্নীতকরণ, ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড সমস্যা সমাধান এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি—এখন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারকদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সমস্যার সমাধান না হলে বার্ষিক পরীক্ষা সময়মতো অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। শিক্ষক নেতাদের সিদ্ধান্ত, সরকারি নির্দেশনার অগ্রগতি দেখতে না পেলে তারা পরীক্ষায় অংশ নেবেন না, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।


