অর্থনীতি ডেস্ক
দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন করে মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দামে সমন্বয় প্রয়োজন হওয়ায় শনিবার ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি সকল গ্রেডের স্বর্ণের নতুন দর নির্ধারণ করে। ঘোষিত এ মূল্য ৩০ নভেম্বর রোববার থেকে কার্যকর হবে। এতে করে বাজারে সর্বোচ্চ গ্রেডের ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিপ্রতি দাম দুই লাখ ১০ হাজার টাকারও ওপরে পৌঁছেছে, যা দেশের স্বর্ণবাজারে নতুন এক মূল্যস্তর নির্দেশ করছে।
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলছে, কারণ দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক দরের ভিত্তিতেই মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন। এ কারণে স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বর্ণের খুচরা দর সমন্বয় করা হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিপ্রতি দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৫৭০ টাকা। পূর্বের দামের তুলনায় এটি ভরিপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০৩ টাকা পর্যন্ত বেশি। এ ছাড়া ২১ ক্যারেট স্বর্ণের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ভরিপ্রতি ২ লাখ ১ হাজার ৬ টাকা। মাঝারি মানের ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের ভরিপ্রতি দাম হবে ১ লাখ ৭২ হাজার ২৮৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি স্বর্ণের ভরিপ্রতি নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩২৭ টাকা। বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও মান অনুযায়ী ভিন্ন গ্রেডের স্বর্ণের দাম ভিন্নভাবে সমন্বয় করা হয়, যা দেশের স্বর্ণবাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত।
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি সাধারণত স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন খাতকে প্রভাবিত করে। বিয়ে বা উৎসব মৌসুমে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে মূল্য আরও বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। অতীতে এমন কয়েকটি সময়ে স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দামে অস্থিরতা দেখা গেছে, যা মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন এই মূল্য বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে বাজারে ক্রেতাসাধারণকে স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশি ব্যয় বহন করতে হবে, বিশেষ করে যেসব পরিবার বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, রুপার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। নতুন ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২২ ক্যারেট রুপার ভরিপ্রতি দাম ৪ হাজার ২৪৬ টাকা আগের মতোই থাকবে। এছাড়া ২১ ক্যারেট রুপার ভরিপ্রতি দাম ৪ হাজার ৪৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট রুপার দাম ৩ হাজার ৪৭৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ভরিপ্রতি ২ হাজার ৬০১ টাকা একইভাবে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বৈশ্বিক রুপার বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না থাকায় স্থানীয় মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি অনিশ্চিত অবস্থায় থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পায়। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক বাজারে ডলারের মান ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণে বিনিয়োগের প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর বাজারের ওপর পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাজারেও পরিবর্তন অব্যাহত থাকতে পারে। এতে সাধারণ গ্রাহকের পাশাপাশি স্বর্ণ ব্যবসায়ীরাও সতর্কতার সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নতুন দামের ফলে দেশের স্বর্ণবাজার আরও কিছুদিন অস্থির থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। তাছাড়া ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল না হলে স্বর্ণের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে স্বর্ণের দরে আরও পরিবর্তন আনতে পারে।
দেশের বাজারে স্বর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান ধাতু হিসেবে গ্রাহক এবং ব্যবসায়ী উভয়ের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এ মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা বিবেচনায় স্থানীয় বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রবণতা আপাতত অব্যাহত থাকারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।


