নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় দেশে গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান সময়টি এমন এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে একটি পুরোনো শাসনব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি জানান, স্বাধীনতার সময় যে রাষ্ট্রীয় স্বপ্ন, বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে দেশ এগিয়েছিল, দীর্ঘ সময়েও রাষ্ট্র তা পূরণ করতে পারেনি। এই বাস্তবতা থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণআন্দোলনের জন্ম হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার প্রত্যাশা করছে সরকার। এই ভিত্তি একদিকে গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করবে, অন্যদিকে জনগণের কাছে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনবে। তাঁর ভাষায়, একটি বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তবে আসন্ন নির্বাচন সেই লক্ষ্যে অগ্রযাত্রার সূচনা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহিংসতা ও প্রতিপক্ষ দমনের প্রবণতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। যুক্তি ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিবর্তে হত্যাচেষ্টা বা সহিংসতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের মুখোমুখি হওয়াই রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত পরীক্ষা, এবং সহিংস পথ বেছে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। নতুন বাংলাদেশে এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনটি কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অনুশীলন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সংস্কারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণ তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে। তিনি জানান, জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই গণতন্ত্রের যাত্রা নতুন ও পরিবর্তিত রূপে এগিয়ে যেতে পারে।
জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা হাসান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল ভেঙে পড়া অবস্থায়। সেই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করে একটি কার্যকর পথে ফিরিয়ে আনার কাজই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি সময়ের মধ্যে একটি সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করা সহজ নয়। সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচারপ্রক্রিয়া ও কাঠামোগত সংস্কার সফলভাবে সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি জানান, স্বাভাবিক যে প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা সরকারের রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক প্রস্তুতির বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী পক্ষের সংগঠিত সহিংস তৎপরতা এবং পেছন থেকে আঘাত হানার প্রবণতার কারণে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। জনগণ যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারে, সে পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে নির্বাচন ব্যাহত করার অপচেষ্টা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সমাজে একটি পক্ষ ভীতি ছড়িয়ে জনগণকে ভোটদান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে আশ্বস্ত করা এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি হতে না দেওয়া। সরকার তার সামর্থ্য অনুযায়ী সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
সার্বিকভাবে উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো উঠে আসে, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


