ইসলামি শিক্ষার প্রসারে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন

ইসলামি শিক্ষার প্রসারে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন

রাজধানী ডেস্ক

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের বই বিতরণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় ফাউন্ডেশনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এ কার্যক্রমের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ শিক্ষা কার্যক্রম বিভাগ।

উদ্বোধনী পর্বে ধর্ম উপদেষ্টা প্রতীকীভাবে কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে পাঠ্যবই তুলে দেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে দেশের ৮ হাজারের বেশি মসজিদে শিশু ও বয়স্ক শিক্ষার্থীদের মাঝে পর্যায়ক্রমে ১২ লাখের বেশি বই বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে প্রাক্-প্রাথমিক, প্রাথমিক, কিশোর শিক্ষা, বয়স্ক সাক্ষরতা ও গণশিক্ষা স্তরের বই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বইগুলোর পাঠ্যসূচিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা, আরবি ভাষা, কোরআন তিলাওয়াত, হাদিস, আকাইদ ও ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে। সরকারের অর্থায়নে ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে এ শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ধর্ম উপদেষ্টা ড. খালিদ হোসেন তার বক্তব্যে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ধর্মীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিস্তারে ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এনে যুগোপযোগী পাঠ্যবই, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠদানের তদারকি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার ইসলামি শিক্ষা প্রসারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষাকে সামাজিক সাক্ষরতা ও নৈতিক শিক্ষার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ধর্ম উপদেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কোরআনের তালিমের ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়ে বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামি শিক্ষার মৌলিক গ্রন্থ, বিশেষত কোরআনের ভাষাগত ও নৈতিক পাঠ অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে একটি সমন্বিত রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষা ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।

তিনি আরও জানান, ইমাম, আলেম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার স্কলারশিপ কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে। এ স্কলারশিপের আওতায় দেশ ও দেশের বাইরে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নের জন্য আর্থিক সহায়তা, ভর্তি-প্রক্রিয়া সহায়তা, গবেষণা অনুদান এবং ভাষাগত প্রস্তুতির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণা, দাওয়াহ কার্যক্রম, ইসলামি অর্থনীতি, আইন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও ভাষা-গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবে।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে ধর্ম উপদেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন প্রস্তুতি সম্পর্কেও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনী পরিবেশ স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, দায়িত্বে থাকার সময়টুকুতে সরকার সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম কেবল ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজে সাক্ষরতা বৃদ্ধি, মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক শৃঙ্খলা, মানবিক আচরণ, পরস্পর সহনশীলতা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রান্তিক পর্যায়ে সাক্ষরতা বৃদ্ধির যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম অন্যতম সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে গ্রামীণ, শহরতলি ও সুবিধাবঞ্চিত জনপদে যেখানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকার সীমিত, সেখানে মসজিদ শিক্ষা কার্যক্রম একটি কার্যকর বিকল্প পাঠকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিক্ষকদের জন্য বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, ডিজিটাল উপস্থিতি তদারকি, পাঠমূল্যায়ন পরীক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিভাবক সমন্বয় সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি, কোরআন তিলাওয়াতের বিশুদ্ধতা যাচাই, আরবি ভাষা শিক্ষায় ধ্বনিগত অনুশীলন এবং বাংলা-ইংরেজি শিক্ষায় মৌলিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ পাঠ-পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার দুই বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ ও মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন। অধ্যাপক আলী রিয়াজ তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সাক্ষরতার সমন্বয় বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। অধ্যাপক মনির হায়দার বলেন, শিক্ষা কার্যক্রমের মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের ধারাবাহিক তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানান, বিতরণকৃত বইগুলো জাতীয় পাঠ্যক্রমের আলোকে প্রস্তুত করা হলেও এতে ইসলামি নৈতিকতার মৌলিক পাঠ সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত শিক্ষামডেল অনুসরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ আরও জানায়, কার্যক্রমটি সারাদেশে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং প্রতিটি মসজিদে পাঠদানকারী শিক্ষককে নির্দিষ্ট পাঠপরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কাঠামোর আওতায় যুক্ত করা হবে।

শিক্ষা কার্যক্রমের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষার সম্প্রসারণ দেশের সার্বিক সাক্ষরতার হার, নৈতিক শিক্ষার বিস্তার, সামাজিক অপরাধপ্রবণতা হ্রাস, যুবসমাজের মূল্যবোধ বিকাশ, ধর্মীয় জ্ঞানের বিশুদ্ধ চর্চা, সমাজে সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামি গবেষণায় বাংলাদেশি মেধাবীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, মানসম্মত পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই কার্যক্রম শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে।

রাজধানী শীর্ষ সংবাদ