আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখন ২০২৫ সালের শেষ প্রহর চলছে, তখন প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতি ইতোমধ্যে ২০২৬ সালকে স্বাগত জানিয়েছে। সময় অঞ্চলের ভিন্নতার কারণে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নতুন বছর বরণের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছে দেশটি। গ্রিনিচ মান সময় (GMT) অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় কিরিবাতির কিরিমাটি, যা ক্রিসমাস আইল্যান্ড নামেও পরিচিত, সেখানে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টায় পৌঁছায় এবং শুরু হয় খ্রিষ্টীয় নববর্ষের উদ্যাপন।
কিরিবাতি ৩৩টি প্রবালদ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। দেশটির ভৌগোলিক বিস্তৃতি প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর ছড়িয়ে রয়েছে। ১৯৯৪ সালে কিরিবাতি আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার (International Date Line) পশ্চিম পাশে সময় অঞ্চল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির সব দ্বীপে একই তারিখ বজায় রাখা, যাতে প্রশাসনিক কার্যক্রম, বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সামাজিক সমন্বয় সহজ হয়। সময় অঞ্চল পরিবর্তনের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তই আজ কিরিবাতিকে বৈশ্বিক বর্ষবরণের ‘প্রথম ঘণ্টা’ বাজানোর মর্যাদা এনে দিয়েছে।
কিরিবাতির পরপরই ২০২৬ সাল বরণ করেছে নিউজিল্যান্ড, সামোয়া ও টঙ্গা। GMT ১১টায় নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে শুরু হয় বর্ষবরণের মূল আয়োজন। শহরের আইকনিক স্থাপনা স্কাই টাওয়ারে রঙিন আতশবাজি প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানায় দেশটি। বছরের শেষ দিনের অধিকাংশ সময় অকল্যান্ডে বৃষ্টি থাকলেও, মধ্যরাতের প্রাক্কালে আকাশ ছিল মেঘমুক্ত। অনুকূল আবহাওয়ার সেই সুযোগে আতশবাজির আলোকচ্ছটায় রঙিন হয়ে ওঠে শহরের আকাশ, যা দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি করে উৎসবমুখর পরিবেশ। আলোকোজ্জ্বল সেই মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক বর্ষবরণের অন্যতম দৃশ্যমান অধ্যায়ে পরিণত হয়।
প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর বিশ্বের দৃষ্টি থাকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির দিকে। সিডনি হারবার ব্রিজে মধ্যরাতের মূল মুহূর্তকে কেন্দ্র করে বার্ষিক আতশবাজি প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়, যা বৈশ্বিক বর্ষবরণের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন আয়োজন হিসেবে পরিচিত। মধ্যরাতের আগে, বিদায়ী বছরের শেষ তিন ঘণ্টাজুড়ে চলে ‘ফ্যামিলি ফায়ারওয়ার্ক শো’, যাতে শিশু ও পরিবারের সদস্যরাও নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে উদ্যাপনের সুযোগ পায়। আতশবাজি প্রদর্শনীর পাশাপাশি থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সঙ্গীত পরিবেশনা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। হারবারের জলরাশিতে প্রতিফলিত আলোর বর্ণিল দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধি, পর্যটন আয় ও পরিষেবা খাতে গতিশীলতা তৈরি করে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ২০২৬ সাল বরণের আয়োজন শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে আলোকসজ্জা, আতশবাজি, গণসমাবেশ, কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণ করা হয়েছে। হংকংয়ের ভিক্টোরিয়া হারবার, সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে, ফিলিপিন্সের ম্যানিলা বে, চীনের বেইজিং ও সাংহাইসহ শহরগুলোতে জনসমাগম ছিল উল্লেখযোগ্য। বর্ষবরণের এসব আয়োজন শুধু বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং খুচরা বাণিজ্য, পরিবহন, আতিথেয়তা, পর্যটন ও পরিষেবা খাতে মৌসুমি অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য তৈরি করে। বছরের শেষ ও শুরুর এই সময়কে ঘিরে বিভিন্ন দেশে বিক্রি বাড়ে ভোক্তা পণ্য, ভ্রমণ প্যাকেজ, রেস্তোরাঁ বুকিং, হোটেল সংরক্ষণ ও নগরভিত্তিক বিনোদন টিকিটের।
ইউরোপের ভ্যাটিকান সিটিতেও খ্রিষ্টীয় বর্ষবরণ করা হয় ধর্মীয় রীতি-আচার ও প্রার্থনার মাধ্যমে। সেখানে থাকে পোপের নেতৃত্বে বিশেষ মেস ও শান্তির বার্তা প্রচারের আয়োজন, যা খ্রিষ্টীয় ধর্মাবলম্বীদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ আরও বহু দেশ নতুন বছরের মূল ক্ষণ উদ্যাপনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সময় অঞ্চলভেদে বর্ষবরণের এই ধারাবাহিকতা নতুন বছরকে এক বৈশ্বিক সংযোগের প্রতীকী মুহূর্তে রূপ দেয়। যেখানে নতুন বছরের প্রথম ক্ষণ শুরু হয় কিরিবাতির ক্ষুদ্র দ্বীপে, সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে মহাদেশ থেকে মহাদেশে—আতশবাজি, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও সামাজিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে। প্রতিটি দেশ নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সামাজিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় রীতির আলোকে নতুন বছরকে বরণ করে, যা সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক উৎসবের এক বহুমাত্রিক চিত্র তৈরি করে।


