আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে তাঁদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দেশটিতে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের অস্থিরতায় একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের জন্য অন্যতম গুরুতর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত মিলিয়ে এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ইরানে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলেও তা দ্রুত দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে রূপ নেয়। স্থানীয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লোরেস্তান ও চাহারমাহাল-ও-বাখতিয়ারি প্রদেশে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার পর্যন্ত কমপক্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে রাষ্ট্রসমর্থিত গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থা। নিহতদের মধ্যে একজন বসিজ মিলিশিয়ার সদস্য, যিনি রেভলিউশনারি গার্ডস-সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বলে কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর বার্তায় লিখেছেন, ‘আমরা প্রস্তুত—তৈরি ও সজ্জিত,’ যা বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বা কৌশলগত সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে। যদিও এই মন্তব্যের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দেননি, তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের সংকেত হিসেবে তেহরান গ্রহণ করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও তীব্র করতে পারে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলি লারিজানি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা ডেকে আনবে। লারিজানির ভাষ্য, এমন পদক্ষেপ শুধু দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা বাড়াবে না, বরং লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সংঘাতের সমীকরণও পরিবর্তন করতে পারে।
ইরানের স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিক্ষোভ দমন নিয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা এসেছে। পশ্চিমাঞ্চলের এক স্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো বেআইনি সমাবেশ বা অস্থিরতা ‘কঠোরভাবে’ দমন করা হবে। তাঁর এই বক্তব্য বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার মাত্রা বাড়ার আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। ইরানে অতীতের বড় অস্থিরতাগুলোতেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গণগ্রেপ্তার ও বিক্ষোভ দমন অভিযান দেখা গেছে। ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’, ২০১৭–১৮ ও ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী বিক্ষোভ এবং ২০২২ সালে ‘হিজাব বিরোধী’ আন্দোলনের সময়ও ব্যাপক ধরপাকড় ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রতিক্রিয়ার নজির রয়েছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা, কারণ দেশটি বর্তমানে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব একসঙ্গে মোকাবিলা করছে।
বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো। তাঁদের দাবি, কিছু এলাকায় সরাসরি গুলি চালিয়ে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে, যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
অভ্যন্তরীণ সংকটের দায় স্বীকার করে বৃহস্পতিবার বক্তব্য দিয়েছেন ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ‘দোষ আমাদেরই… দোষ খুঁজতে আমেরিকা বা অন্য কারো দিকে তাকাবেন না।’ তাঁর মতে, জনগণকে সন্তুষ্ট রাখতে সঠিকভাবে সেবা দেওয়ার ব্যর্থতা থেকেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট নিয়ে বিক্ষোভ নেতাদের সঙ্গে সংলাপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ইরানি শাসন কাঠামোর প্রচলিত নিরাপত্তা-নির্ভর প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের সহিংসতার খবর সংলাপ উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয়ও তৈরি করেছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সরকার অর্থনৈতিক উদারীকরণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে কিছু মুদ্রা বিনিময় বিধিনিষেধ শিথিল করা হলেও তা বাজারে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের তীব্র পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মত। ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা বোঝাতে সরকারি পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে দেশটির মুদ্রা ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে এবং আমদানি-নির্ভর পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করেছে। বেকারত্ব, শিল্প খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট মিলিয়ে এই অর্থনৈতিক দুর্বলতা সামাজিক অসন্তোষকে বিক্ষোভে রূপ দিতে ভূমিকা রেখেছে।
ইরানের বর্তমান সংকটকে আঞ্চলিক রাজনীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের আলোতেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। গত বছরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান অভিযানে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঘটনা, সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের মিত্র সরকারের পতন, এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর সামরিক চাপ—এসব বিষয় ইরানের আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থানকে নতুন বাস্তবতায় ঠেলে দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক এই চাপের প্রভাব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও জনমনস্তত্ত্বেও প্রতিফলিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কড়া সমালোচনা করে লারিজানি আরও বলেন, ‘ট্রাম্পই এই দুঃসাহসিকতা শুরু করেছেন,’ এবং তাঁর মতে, মার্কিন জনগণের উচিত নিজেদের সেনাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া। তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উত্তেজনা বাড়ালে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্র প্রসারিত হতে পারে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলবে।
সব মিলিয়ে ইরানে বিক্ষোভ ও তার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরান রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার বার্তা দিলেও মাঠপর্যায়ের কঠোর নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।


