রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নির্বাচনি হলফনামা-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষত, তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা ও বাৎসরিক আয় ১৬ লাখ টাকা দেখানো নিয়ে বিভিন্ন অসত্য ও বিকৃত তথ্য প্রচার করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। ১ জানুয়ারি মধ্যরাতে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব তামীম আহমেদের পাঠানো এক বার্তায় এসব বিভ্রান্তির ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়।
নাহিদ ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বার্তায় বলা হয়, উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালনকালে সাত মাসে তাঁর মোট আয় ছিল ১১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯ টাকা। মাসিক গড় আয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হিসেবে বেতন-ভাতা বাবদ এই অর্থ অর্জিত হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর নাহিদ ইসলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে মাসিক ১ লাখ টাকা সম্মানিতে কাজ শুরু করেন। উপদেষ্টা ও পরামর্শক পেশা থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাঁর মোট আয় ১৬ লাখ টাকা হিসেবে আয়কর রিটার্নে উল্লেখ রয়েছে। একই আয়-বর্ষে আয়ের ওপর তিনি ১ লাখ ১৩ হাজার ২৭৪ টাকা আয়কর পরিশোধ করেন। দলীয় বার্তায় দাবি করা হয়, আয়কর রিটার্নে এই তথ্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকায় হলফনামায় বাৎসরিক আয় ১৬ লাখ টাকা হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে।
নাহিদ ইসলামের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা উল্লেখ করা নিয়ে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, দলীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, এটি উপদেষ্টা ও পরামর্শক পেশা থেকে অর্জিত আয়, হাতে থাকা নগদ অর্থ, পূর্ববর্তী সঞ্চয়, বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণালংকার ও আর্থিক উপহারের বর্তমান বাজারমূল্যের সমষ্টি। বাংলাদেশের নির্বাচনি আইনে প্রার্থীর সম্পত্তির উৎস ও বর্তমান বাজারমূল্য একত্রে হলফনামায় উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা থাকায় এই মোট পরিমাণ প্রদর্শিত হয়েছে বলে দল দাবি করে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো আরেকটি দাবি, নাহিদ ইসলামের পেশা শিক্ষকতা হিসেবে হলফনামায় দেখানো হয়েছে—এমন তথ্যকে ‘অপতথ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে বার্তায় বলা হয়, আয়কর রিটার্ন কিংবা হলফনামার কোথাও তাঁর পেশা শিক্ষকতা হিসেবে উল্লেখ নেই। হলফনামার ৪ নম্বর কলামে স্পষ্টভাবে তাঁর বর্তমান পেশা পরামর্শক ও পূর্ববর্তী পেশা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
ব্যাংক হিসাব-সংক্রান্ত তথ্যেও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে বলে দল অভিযোগ করেছে। বার্তায় উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের সময় তাঁর সোনালী ব্যাংকের একমাত্র অ্যাকাউন্টে জমা ছিল ১০ হাজার ৬৯৮ টাকা ৫৭ পয়সা। সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন ও হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেই একই অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৩ টাকা ৫৭ পয়সা। এছাড়া, নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের জন্য ২৮ ডিসেম্বর সিটি ব্যাংকে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এই দুটি অ্যাকাউন্ট ছাড়া নাহিদ ইসলামের আর কোনো ব্যাংক হিসাব নেই বলে দলীয় বার্তায় দাবি করা হয়।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থার অধীনে উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালনের পর নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের হলফনামা সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষত, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ নেতৃত্বের উত্থান, রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আত্মপ্রকাশের ধারাবাহিকতায় নাহিদ ইসলাম একটি আলোচিত নাম। ফলে তাঁর আর্থিক ও পেশাগত তথ্য নিয়ে আলোচনার বিস্তৃতি তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তবে এনসিপির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, হলফনামায় প্রদত্ত প্রতিটি তথ্য দেশের প্রচলিত আয়কর আইন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ও ব্যাংক হিসাব বিবরণীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
নির্বাচনি হলফনামা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী প্রার্থীর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এতে প্রার্থীর আয়ের উৎস, সম্পত্তির পরিমাণ, দায়-দেনা, ব্যাংক হিসাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও পেশাগত বিবরণ উল্লেখ বাধ্যতামূলক। দলীয় বার্তায় উল্লেখ করা হয়, নাহিদ ইসলাম সংশ্লিষ্ট সব নথি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছেন এবং তা যাচাইযোগ্য। এ প্রেক্ষাপটে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অসত্য তথ্য যাচাই না করে প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানালেও, প্রতিবেদনের স্বার্থে এখানে দলীয় ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়েছে।


