বিএনপির চেয়ারপারসন পদ শূন্য: গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন তারেক রহমান

বিএনপির চেয়ারপারসন পদ শূন্য: গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন তারেক রহমান

 

রাজনীতি ডেস্ক

গত ৩০ ডিসেম্বর জাতির একটি রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত পদটি শূন্য হয়ে পড়েছে। খালেদা জিয়া দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে দলটির সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দলীয় গঠনতন্ত্রের বিধান অনুসারে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার নেবেন বলে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যায়ের অভিমত তৈরি হওয়া এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার প্রস্তুতি চলছে।

দলের গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারার (৩) উপধারায় বলা হয়েছে, “যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে বহাল থাকবেন।” এই বিধান অনুসারে বর্তমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বভারকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে গ্রহণ করবেন। তথ্য অনুযায়ী, দলটি শিগগিরই এই পদে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার কাজ সম্পন্ন করবে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ শৃঙ্খল বদলে গেছে। ১৯৮৪ সালের ১০ মে থেকে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪১ বছর ধরে তিনি দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি দেশটির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং বিএনপির নীতিনির্ধারণী নেতৃত্ব হিসেবে অভিহিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ফলে এখন দলের অভিজ্ঞ নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়া বেশ কিছু বছর ধরেই বিভিন্ন রোগের সঙ্গে লড়াই করে আসছিলেন। দীর্ঘ চিকিৎসা প্রত্যাশায় তিনি দেশের ও দেশের বাইরে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং চিকিৎসাজনিত কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি কম জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে গত কয়েক বছর তিনি কারাবন্দি অবস্থায় ছিলেন, এরপর মুক্তি পেয়ে আবার চিকিৎসার লক্ষ্যে বাইরে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ মতবেরোধ ও অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে দলের অভিজ্ঞ নেতৃত্বের একটি যুগের সমাপ্তি ঘটে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী নেতারা জানিয়েছেন, গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী এখন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। তিনি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। দলের গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারার উপধারা ২-এ বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সমস্ত দায়িত্ব পালন করবেন। এই বিধান মোতাবেক দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন তারেক রহমান।

তারেক রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। ২০০৭ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তিনি গ্রেপ্তার হন এবং পরে মুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে যান।

সেখানে অবস্থানকালে ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবন্দি অবস্থায় থাকাকালীন তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দল পরিচালনা করেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরেই দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন। দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন।

দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, চেয়ারপারসন পদ শূন্য হওয়ায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সামনের রাজনৈতিক প্রয়োগে সংগঠনকে প্রস্তুত করা অত্যন্ত জরুরি। সেই প্রেক্ষাপটে শিগগিরই স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে। তারা জানান, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বৈঠকে তারেক রহমানকে ঐ পদে দায়িত্ব নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ঘোষণা করা হতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে অভিহিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দলের শীর্ষ পদ শূন্য হওয়া এবং নতুন নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ গতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। দলের পাঠক ও সমর্থকদের মধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও আগামী নির্বাচন মোকাবেলায় নতুন নেতৃত্বের কৌশল নির্ধারণে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। এছাড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া দলীয় স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষায় সহায়ক হবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ