অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
চট্টগ্রামের বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো রপ্তানি পণ্যবাহী ও খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে পূর্বঘোষিত ৬০ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর ১৩টি সেবা খাতে আগামী ছয় মাসের জন্য ২০ শতাংশ হারে মাশুল বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। ভবিষ্যতে ডিপো চার্জ নির্ধারণে সম্ভাব্য বিরোধ ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা এড়াতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তাবও বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি তুলে ধরে চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা ছাড়াই রপ্তানি পণ্যবাহী ও খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট সেবায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বৃদ্ধি ঘোষণা করে। এতে রপ্তানি খাত–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ডিপো সেবাগ্রহীতারা ওই সময় চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানালেও ডিপো কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রাখে। পরবর্তীতে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বর্ধিত ট্যারিফ আদায়ের ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করলে ডিপোগুলো নতুন মাশুল কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়।
এ অবস্থায়, ১১ নভেম্বর ডিপো মালিকদের সংগঠন বেসরকারি সব ডিপো একযোগে রপ্তানি ও খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করে। বন্দর চেয়ারম্যানের অনুরোধে ওই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের উদ্যোগে ডিপো মালিক, সেবাগ্রহীতা, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও রপ্তানি খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর রপ্তানি ও খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং–সংক্রান্ত ১৩টি সেবা খাতে আগামী ছয় মাসের জন্য ২০ শতাংশ হারে মাশুল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বৈঠক শেষে বলেন, বন্দর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে এবং উভয় পক্ষকে সমঝোতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। তিনি জানান, ৬০ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধির পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত বাতিল করে ছয় মাসের জন্য ২০ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধিতে ডিপোগুলো সম্মত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ডিপো চার্জ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং অংশীজনদের মধ্যে মতবিরোধ এড়াতে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চার্জ কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি প্রস্তাব আকারে রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও অংশীজনরা বিবেচনা করতে পারে।
ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপো রেট ছয় মাসের জন্য ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, ছয় মাস পর ব্যয় কাঠামো ও পরিচালন ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে চার্জ বৃদ্ধির বিষয়টি পুনরায় বিবেচনায় আসতে পারে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিরোধ এড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাবও তারা ভবিষ্যতে বিবেচনা করতে পারে বলে জানান তিনি।
ডিপো সেবাগ্রহীতা পক্ষের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ছয় মাসের জন্য ২০ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধি রপ্তানি খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে থাকবে এবং এতে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাতের সম্ভাবনা কমে এসেছে। তারা মনে করেন, পূর্বঘোষিত ৬০ শতাংশ চার্জ বৃদ্ধি কার্যকর হলে রপ্তানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেত, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা এবং ডিপো কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের শীর্ষ সংগঠনের সাবেক সহ–সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, অংশীজনদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ডিপো চার্জ নির্ধারণের এই সিদ্ধান্ত রপ্তানি–সংশ্লিষ্টদের ব্যয় ও কার্যক্রমগত দূরত্ব কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় ডিপোগুলোর কার্যক্রম পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, যা সামগ্রিক রপ্তানি লজিস্টিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
বন্দর–সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বর্তমানে বছরে প্রায় ২৫ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে, যার একটি বড় অংশ রপ্তানি পণ্যবাহী ও খালি কনটেইনার–সংক্রান্ত কার্যক্রম। এসব ডিপো বন্দর–বহির্ভূত কনটেইনার সংরক্ষণ, লোডিং–আনলোডিং, পরিবহন সমন্বয়, স্ক্যানিং সহায়তা, ডকুমেন্টেশন ও কাস্টমস–সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ডিপো চার্জ কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন পুরো রপ্তানি লজিস্টিক ব্যবস্থার ব্যয়, সময় ব্যবস্থাপনা, শিপিং শিডিউল, ডকুমেন্টেশন ব্যয় ও পরিবহন কাঠামোতে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদ ও বন্দর–ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষকদের মতে, ডিপো চার্জ কাঠামো নির্ধারণে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হলে তা চার্জ নির্ধারণে বৈশ্বিক বন্দর লজিস্টিক মানদণ্ড, ব্যয় কাঠামো, সেবার গুণগত সূচক, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, পরিবহন দূরত্ব, জাহাজ হ্যান্ডলিং সময়, কনটেইনার ড্যামারেজ ঝুঁকি, অপারেশনাল দক্ষতা, মুদ্রা বিনিময় প্রভাব এবং ডিজিটাল লজিস্টিক ব্যয়–সহ নানা বিষয় বৈজ্ঞানিক ও তথ্য–নির্ভর পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ডিপো চার্জ কাঠামো একটি গ্রহণযোগ্য ও বিরোধ–মুক্ত কাঠামোতে স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা বাড়বে।
সরকারি ও বেসরকারি বন্দর–ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় অংশীজন–ভিত্তিক আলোচনা ও ব্যয় পুনর্মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ডিপো চার্জ কাঠামো নির্ধারণে নির্দিষ্ট কোনো একক জাতীয় কাঠামো না থাকায় অতীতে বিভিন্ন সময়ে চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব কার্যকর হলে ভবিষ্যতে চার্জ কাঠামো নির্ধারণে একটি মানসম্মত ও অংশীজন–গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ছয় মাস ডিপোগুলো ২০ শতাংশ হারে মাশুল বৃদ্ধি কার্যকর করবে এবং হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ধারায় পরিচালিত হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে চার্জ কাঠামো পুনর্মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ–সংক্রান্ত প্রস্তাব আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে উত্থাপন করবে বলে জানা গেছে।


