খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতির শোক ও বাংলাদেশের প্রতি সংহতি

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতির শোক ও বাংলাদেশের প্রতি সংহতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তিনি শোকবার্তায় খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান। শোকবার্তাটি কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের কাছে পাঠানো হয়।

শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ও নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে দেশটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি এই শোকাবহ মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকার বার্তা দেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঐতিহাসিক বন্ধনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।

রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুম এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপররাষ্ট্রপতি, উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেনশিয়াল কোর্টের চেয়ারম্যান শেখ মানসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান পৃথক পৃথক শোকবার্তায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির প্রতি সমবেদনা জানান। শোকবার্তাগুলিতে মরহুমার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং বাংলাদেশের জনগণের শোকের মুহূর্তে সংহতি প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি আরও দুই দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বাধীন সরকারসমূহে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, কৃষি ও শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচিত।

বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত অন্যতম, খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তার সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি পায়, যা প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ-নির্ভর সম্পর্ক এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নেয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতৃত্বের শোক প্রকাশ এবং বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রদর্শন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরনের শোকবার্তা সাধারণত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ঐতিহাসিক সংযোগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষত প্রবাসী কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জলবায়ু–সংক্রান্ত অংশীদারত্বে বাংলাদেশ–আমিরাত সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাই, শোকবার্তাগুলোর মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কের মানবিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি আরও দৃঢ় হওয়ার বার্তা পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত রয়েছেন। তারা দেশটির নির্মাণ, সেবা, বন্দর-লজিস্টিক, স্বাস্থ্যসেবা, আতিথেয়তা ও প্রযুক্তিখাতে অবদান রাখছেন। বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে আমিরাত শীর্ষ গন্তব্যগুলোর একটি। ফলে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের শোকবার্তা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও এক প্রতীকী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়—যা দেশ ও নেতৃত্বের প্রতি আমিরাতের নীতিগত সমর্থন ও সম্মান নির্দেশ করে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আরও মনে করেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতৃত্বের শোক প্রকাশ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে। বিশেষত, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্য-লজিস্টিক, অভিবাসন ও জলবায়ু-সহযোগিতার সমীকরণে বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অংশীদার, যেখানে আমিরাত বিনিয়োগ ও জ্বালানি কৌশলের মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ফলে, শোকবার্তাগুলোর অন্তর্নিহিত বার্তা শুধু শোক প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ধারাবাহিকতার কূটনৈতিক সংকেত হিসেবেও বিশ্লেষিত হচ্ছে।

শোকবার্তাগুলোর প্রেরণ কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে সম্পন্ন হলেও এতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনগণ ও রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রতি মানবিক বার্তার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বার্তায় ব্যবহৃত শব্দচয়ন ও সংহতির উল্লেখ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, যা বাংলাদেশ–আমিরাত অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ