আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে সম্প্রতি দুই দিনের ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে গমন করেন। সফর শেষে তিনি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
গত ০২ জানুয়ারি শুক্রবার চেন্নাইয়ের আইআইটি মাদ্রাজে টেকনো-এন্টারটেইনমেন্ট ফেস্ট ‘শাস্ত্র ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জয়শঙ্কর জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেষকৃত্যে ভারতের পক্ষে উপস্থিত থাকাই ছিল সফরের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় আসন্ন নির্বাচনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের বিকাশ ঘটবে বলে ভারত প্রত্যাশা করে।
জয়শঙ্কর বলেন, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আঞ্চলিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি উল্লেখ করেন, অধিকাংশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রই মনে করে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের নিজস্ব উন্নয়নকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ‘বিশ্ব পরিবার’ ধারণার ব্যাখ্যা তুলে ধরেন এবং জানান, অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাই ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি। সফরকালে তিনি এই বার্তাই বাংলাদেশে পৌঁছে দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, সাধারণভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিপদের সময় সহায়তা প্রদানই সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের প্রকাশ। তিনি বলেন, ভারত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি সহায়তার নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন বিভিন্ন সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান হয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে টিকা সরবরাহের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, অধিকাংশ প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রথম প্রতিষেধক টিকা ভারত থেকেই গ্রহণ করেছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট খাদ্য, সার এবং জ্বালানি সংকটের সময়েও ভারত সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা প্রদান করেছে। তিনি শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় ভারতের ৪ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তার কথাও তুলে ধরেন। এছাড়া ‘দ্বিতয়া’ সাইক্লোন এবং ‘দ্বিতয়া’ পরবর্তী দুর্যোগ পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কায় প্রাথমিক সহায়তা প্রেরণে ভারতের অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। এসব উদাহরণের মাধ্যমে তিনি জানান, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির রূপরেখা তুলে ধরে জয়শঙ্কর বলেন, শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ভারতের আত্মরক্ষার অধিকার সংরক্ষিত এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ভারত নিজেই গ্রহণ করবে। সন্ত্রাসবাদ এবং সীমান্তপারের নিরাপত্তা হুমকির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সহিংসতা এবং সহযোগিতা একই সঙ্গে চলতে পারে না; আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখতে শত্রুভাবাপন্ন কার্যক্রম বন্ধ হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, সীমান্তপারে সন্ত্রাসবাদের ঘটনা আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক প্রবৃদ্ধির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। এ কারণে জলবণ্টন ব্যবস্থার মতো কৌশলগত সুবিধা বাতিল করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উচ্চারণ করেননি, তবে তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি, কৌশলগত সহযোগিতা এবং শত্রুভাবাপন্ন কার্যক্রম মোকাবিলায় ভারতের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনের প্রতি ভারতের আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা এবং নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা মূলত দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তাকেই প্রতিফলিত করে। বিশ্লেষকরা বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ কূটনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা না হলে দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এছাড়া ভারতের বিদেশনীতি যে আঞ্চলিক সম্পর্ক, অংশীদারিত্ব, অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতাকে একই কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে, সেটিও জয়শঙ্করের বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।


