রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে রাজনৈতিক চাপ ও নেতৃত্ব সংকটের মুখোমুখি রয়েছে। দলের প্রথম উল্লেখযোগ্য বিতর্ক শুরু হয় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠনের মাধ্যমে। এ ঘটনার পর থেকে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগের ধারা শুরু হয় এবং তা দ্রুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে; বর্তমানে কেন্দ্রীয়সহ সারা দেশের পরিচিত নেতাদের অধিকাংশই পদত্যাগ করেছেন।
এ বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ ও অসন্তোষের সংকেত দেখা দিয়েছে। দলের প্রধান নাহিদ ইসলামের হলফনামায় প্রদর্শিত ব্যক্তিগত আয় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ বা দল ত্যাগ করা এনসিপির জন্য গুরুতর ক্ষতি স্বরূপ। ইতিমধ্যেই পদত্যাগের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং দলের ভেতরে থাকা নেতাদেরও কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন, যিনি মিডিয়া সেলের প্রধান এবং পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের কো-লিড ছিলেন, বৃহস্পতিবার রাতে সমস্ত পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই দিন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীনও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ ও কার্যক্রম থেকে সরে যাওয়ার ফলে দলের অভ্যন্তরীণ সংহতি ও কার্যক্রমের প্রভাব ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
নির্বাচনি সমঝোতা ও জোট নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ গভীর হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবার এবং যোদ্ধারা এনসিপির জামায়াতের সঙ্গে জোটকে তাদের প্রত্যাশার বিপরীত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। অনেক কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতা পদত্যাগ করছেন বা কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, পদত্যাগের এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং সিদ্ধান্তগুলো দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন—ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানী, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, মীর আরশাদুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, খান মো. মুরসালীন, মুশফিক উস সালেহীন, ওয়াহিদুজ্জামান ও আল আমিন টুটুল। পদত্যাগকারীরা উল্লেখ করেছেন, দলটি যেভাবে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করেছে, তা তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, নতুনভাবে গঠিত এনসিপির জন্য শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন গুরুতর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। তিনি উল্লেখ করেন, দলটি যদি এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজনৈতিক দিক থেকে এটি শক্তিহীন হয়ে পড়বে। পদত্যাগকারীরা দলের জোট সংক্রান্ত নীতিগত অবস্থানকে তাদের আদর্শ ও বিশ্বাসের পরিপন্থী মনে করছেন।
পদত্যাগের পাশাপাশি, দলের বিভিন্ন আসনে ঘোষিত বা সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যেও পদত্যাগের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। দলের মধ্যে সংহতি বজায় রাখতে শীর্ষ নেতাদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এনসিপি রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর মুখে পড়বে। বর্তমানে দলটি নতুন ধারার রাজনীতি থেকে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে আপসের পথে চলে এসেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপি যদি শীঘ্রই অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসন ও নেতাদের সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়, তবে এটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে হুমকির মুখে ফেলবে।


