প্রার্থিতা বাতিলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ জামায়াত নেতার

প্রার্থিতা বাতিলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ জামায়াত নেতার

রাজনীতি ডেস্ক

কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এ ঘটনায় নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও আচরণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাতে কক্সবাজার শহরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. আযাদ বলেন, মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে হাততালি দিতে দেখা গেছে, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করে। তিনি অভিযোগ করেন, এ ধরনের আচরণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে পক্ষপাতের ইঙ্গিত বহন করে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংবাদ সম্মেলনে ড. আযাদ আরও দাবি করেন, মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের পেছনে ২০১৩ সালের একটি আদালত অবমাননার মামলাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁর মতে, ফৌজদারি অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে না। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ওই আদালত অবমাননার মামলা দায়ের হয়েছিল। মামলাটি আদালত অবমাননা সংক্রান্ত আইনি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়েছে এবং এটি কোনো প্রচলিত ফৌজদারি অপরাধ নয়। নির্বাচন সংক্রান্ত আইনে কোনো আদালত অবমাননার মামলাকে সরাসরি নির্বাচনী অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য করার বাধ্যবাধকতা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, তাঁর দাখিলকৃত হলফনামায় ঋণখেলাপি, কর ফাঁকি, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ কিংবা দুর্নীতির মতো কোনো অভিযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত যোগ্যতা-অযোগ্যতার শর্ত অনুযায়ীও এ ধরনের মামলার ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিল করার সুযোগ নেই। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও একই আদালত অবমাননার মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন আইনি পর্যালোচনা শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা এটিকে নির্বাচনী অযোগ্যতা হিসেবে গ্রহণ করেননি। এমনকি ওই মামলায় সাজা ঘোষণার পরও তিনি প্রায় দেড় বছর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ওই সময় সংসদ কিংবা আদালত—কোনো পক্ষ থেকেই মামলাটিকে নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

এবার একই মামলার ভিত্তিতে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করাকে তিনি নজিরবিহীন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আদালত অবমাননার সাজা কার্যকর থাকলেও সংসদে তাঁর সদস্যপদ বহাল ছিল, যা প্রমাণ করে, ওই মামলা বা সাজা নির্বাচনী যোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অযোগ্যতার শর্ত পূরণ করে না।

মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ও বিরতির সময়কার প্রশাসনিক আচরণ নিয়েও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই চলাকালে বিরতির সময়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে একটি নতুন পিটিশন গ্রহণ করা হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ ও নিরপেক্ষতার ন্যূনতম মানদণ্ডের লঙ্ঘন। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে প্রার্থী-নির্বিশেষে সমানভাবে পরিচালনার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এ ধরনের আলাদা বৈঠক বা পিটিশন গ্রহণ তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তিনি দাবি করেন।

নির্বাচন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের ভোটার ও রাজনৈতিক অংশীজন একটি অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করে। কিন্তু যাচাই-বাছাই পর্বেই প্রশাসনিক আচরণ ও আইনি ব্যাখ্যায় ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে নির্বাচন নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি সতর্ক করেন, প্রশাসনিক আচরণে সমতা, নিরপেক্ষতা ও প্রার্থী-নির্বিশেষে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা না হলে নির্বাচনী পরিবেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে নির্বাচন নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। তবে তিনি ব্যক্তিগত মতামত বা কোনো ভবিষ্যদ্বাণীমূলক মন্তব্য করেননি; বরং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে ড. আযাদ জানান, মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পুনরায় শুনানির আবেদন ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। পুনঃশুনানিতে আইনি দিকগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পুনঃশুনানিতে সন্তোষজনক প্রতিকার না পাওয়া গেলে তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করবেন, যা দেশের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত একটি পদক্ষেপ।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং সরকারি দায়িত্ব পালনে আচরণগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত লক্ষ্য ও সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণ ও ভূমিকা নিয়ে তাঁর অভিযোগগুলো তিনি নথিভুক্ত আকারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবেন বলেও জানান।

উল্লেখ্য, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, অযোগ্যতার শর্ত মূল্যায়ন এবং পুনঃশুনানির আবেদন—সবই নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর অধীন পরিচালিত প্রক্রিয়া। প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনঃশুনানি ও আপিলের মাধ্যমে পর্যালোচনার সুযোগ দেশের নির্বাচন আইন ও আদালত ব্যবস্থার প্রচলিত বিধানের অংশ।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ