জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) নেতৃত্বগত বিভাজন: জামায়াতের সঙ্গে জোটে যোগ দেওয়ার পর পদত্যাগের ঢেউ

জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) নেতৃত্বগত বিভাজন: জামায়াতের সঙ্গে জোটে যোগ দেওয়ার পর পদত্যাগের ঢেউ

রাজনীতি ডেস্ক

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার পর দলীয় ভিতরে তীব্র টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। পদত্যাগ করেছেন দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতা, যারা জানিয়েছেন যে তারা গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি থেকে সরে আসায় এবং ‘জামায়াত ট্যাগ’ এড়িয়ে চলার জন্য পদত্যাগ করেছেন।

নির্বাচন, গণভোট ও সংস্কারের বিষয়ে এনসিপির নেতারা পূর্বে একমত ছিলেন। তবে নতুন বছরে জামায়াতের সঙ্গে জোট সংক্রান্ত আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে নেতাদের মধ্যে মতবিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলের অভ্যন্তরে এই দ্বন্দ্বের ফলে পদত্যাগকারী নেতারা জানাচ্ছেন, তারা এনসিপির নিজস্ব আদর্শ ও গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গত ৭ ডিসেম্বর এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ ঘোষণা করেছিল। তবে মাত্র ২১ দিন পর, ২৮ ডিসেম্বর এনসিপি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন আট দলীয় জোটে যোগ দেয়। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, ‘বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে আমরা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় এসেছি। নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে আমরা সমমনা দলের সঙ্গে কথা বলেছি।’

জোটে যোগ দেওয়া প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি দেশ গঠনের জোট, নির্বাচনের জোট এবং রাজনৈতিক জোট; ন্যাশনাল ইস্যুতে যেখানেই প্রয়োজন আমরা একসাথে কাজ করব।’ তবে এই সিদ্ধান্তে এনসিপির অন্তত ৩০ কেন্দ্রীয় সদস্য আপত্তি জানিয়েছেন। তারা চিঠিতে জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা, বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ড, নারী সদস্যদের চরিত্রহন এবং সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

পদত্যাগকারী নেতারা উল্লেখ করেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থান করেছি জামায়াতের সঙ্গে জোট করার জন্য নয়। আমরা এনসিপিকে আমাদের নিজস্ব আদর্শে বড় করতে চেয়েছিলাম।’ এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে সংগঠিত না করার ফলে রাজনীতি দুর্বল হয়েছে। আমরা সেই শক্তিকে পলিটিক্যাল ফোর্সে রূপান্তর করতে পারিনি।’

জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ডজন খানেক নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে দলের কিছু কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগের ঘটনাকে অযাচিত মনে করছেন। যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, ‘কিছু সহযোদ্ধা দল থেকে অভিমান দেখিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন বা পদত্যাগ করছেন। আমরা চাইলে বিষয়গুলো সমাধানের জন্য আরও সময় দিতে পারতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘দল কোনো জোটে যায়নি; শুধু সংস্কার নিশ্চিত করতে একটি সমঝোতায় গিয়েছে।’

পদত্যাগের পর এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের মুখ্য সদস্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া। তিনি দলের মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। যদিও ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, তিনি যোগ দিচ্ছেন না। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন জামায়াতে ইসলামীকে নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করেন না এবং বলেন, সমঝোতায় অংশ নিলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।

দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে এই টানাপোড়েনের মধ্যেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এনসিপি প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির জানান, নতুন বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনে ভাল ফলাফল আনা, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করা এবং ভারতীয় আধিপত্যমুক্ত ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ