আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্য বিপদসঙ্কুল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিকে আগ্রাসী হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন যে, এর পেছনে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। খামেনি এসব মন্তব্য তেহরানে দেওয়া এক ভাষণে করেন, যেখানে তিনি লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারকেন্দ্রিক ভূ–রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন।
খামেনি বলেন, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশটির ৩০৩ থেকে ৩০৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের ভাণ্ডারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিন প্রশাসন তৎপরতা চালিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই তেল মজুত বিশ্বের মোট তেল ভাণ্ডারের প্রায় ১৭ শতাংশ, যা ভেনেজুয়েলাকে বৈশ্বিক জ্বালানি ভূ–রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। তিনি দাবি করেন, এই বিপুল জ্বালানি সম্পদের প্রতি আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোতে প্রভাব বিস্তারই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত লক্ষ্য নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন নৌ–অবরোধ, তেলের ট্যাঙ্কার জব্দ এবং বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের ঘটনাগুলোকে তিনি সম্পদকেন্দ্রিক নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেন। খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে ভূমি ও সম্পদ দখলদার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বিভিন্ন দেশে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বলয় সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে দুর্বল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করে, যার প্রতিফলন মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত চলমান সংকটে দৃশ্যমান।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুতের অধিকারী হলেও গত এক দশকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, উৎপাদন সক্ষমতার পতন, বৈদেশিক বিনিয়োগ সংকট, জ্বালানি অবকাঠামোর অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তেল সম্পদকে কার্যকর অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক তেলের দামের পতনের পর ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি তীব্র সংকটে পড়ে। দেশটির তেল রপ্তানি আয় হ্রাস, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি PDVSA–এর সক্ষমতার পতন পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দেশটির জ্বালানি রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভক্তি সৃষ্টি হয়, যখন দেশটির বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো নিজেকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাঁকে সমর্থন দেয়। এর বিপরীতে রাশিয়া, চীন, ইরানসহ কয়েকটি দেশ নিকোলাস মাদুরো সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে। এই বিভাজন লাতিন আমেরিকার জ্বালানি ভূ–রাজনীতিকে বৈশ্বিক শক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
কলম্বিয়ার প্রেক্ষাপটে দেশটি তেল, কয়লা, স্বর্ণ, নিকেল, পান্না, বায়োডাইভার্সিটি ও কৃষিভূমিসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী। কলম্বিয়ার সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নীতি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক বাণিজ্য, রাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়াকে নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও মাদকবিরোধী অভিযানে সহযোগিতা প্রদান করেছে, বিশেষত Plan Colombia–এর মাধ্যমে, যা ২০০০ সালের পর থেকে মার্কিন–কলম্বিয়া নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে বিবেচিত। তবে সম্পদ অনুসন্ধান, খনি ও জ্বালানি প্রকল্পে বহুজাতিক বিনিয়োগ এবং ভূ–রাজনৈতিক সমীকরণ দেশটির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিকে প্রভাবিত করে থাকে।
খামেনির বক্তব্যের আন্তর্জাতিক প্রভাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নীতি ও পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনা করে আসছে এবং লাতিন আমেরিকার কয়েকটি বামপন্থী সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। বিশেষত ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি পরিশোধন ও তেল রপ্তানি সহায়তায় ইরানের ভূমিকা গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ইরান ভেনেজুয়েলায় পরিশোধিত জ্বালানি ও রাসায়নিক উপাদান পাঠিয়ে দেশটির তেল শিল্প পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করে, যা মার্কিন–ইরান বৈশ্বিক ভূ–রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নতুন মাত্রা উন্মোচন করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্পদকেন্দ্রিক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা কেবল জ্বালানি বাজারে বাণিজ্যিক আধিপত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সামরিক উপস্থিতি, নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক স্বীকৃতি, অবকাঠামো বিনিয়োগ, বন্দর ব্যবহার, সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ, আঞ্চলিক জোট এবং অর্থনৈতিক নীতির সমন্বিত কৌশলের অংশ। ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোতে জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাজার বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া সম্পদের কৌশলগত গুরুত্ব টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা কঠিন।
লাতিন আমেরিকার বর্তমান সংকটের বহুমাত্রিক কারণ বিবেচনায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নেতৃত্ব–বিরোধী সংঘাত, মুদ্রানীতি সংকট, সামাজিক অস্থিরতা, বহুজাতিক বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তির প্রভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সম্পদ ও প্রভাবকেন্দ্রিক নীতি আঞ্চলিক ভূ–রাজনীতিকে প্রতিযোগিতার পরিসরে নিয়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ সুশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ছাড়া সংকট সমাধান দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়।
খামেনির বক্তব্য বৈশ্বিক রাজনীতিতে সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের চিত্র তুলে ধরলেও, ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার বাস্তবতা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণের সমন্বয়ে প্রভাবিত—এমন মূল্যায়নই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে প্রতিফলিত হয়েছে।


