জাতীয় ডেস্ক
ঢাকা, ৫ জানুয়ারি ২০২৬—জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ১১৪ জন ব্যক্তির মধ্যে ৮ জন শহীদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে সরকার। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে কবরস্থান এলাকায় আয়োজিত ব্রিফিংয়ে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান শনাক্তকরণ কার্যক্রমের ফলাফল উপস্থাপন করেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতার মধ্যে উদ্ধার হওয়া বহু মরদেহ স্বজনদের অনুপস্থিতিতে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করেছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রাষ্ট্র অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ শনাক্তকরণের জন্য সিআইডির ফরেনসিক ইউনিটকে দায়িত্ব প্রদান করে। এ কার্যক্রমে জাতিসংঘ অনুমোদিত মিনেসোটা প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।
শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান জানান, ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিআইডির ফরেনসিক টিম কবরস্থান এলাকায় অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে ১১৪টি মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং পুনরায় দাফনের কাজ সম্পন্ন করেছে। মিনেসোটা প্রটোকলের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি মরদেহ উত্তোলনের সময় চেইন অব কাস্টডি (Chain of Custody), আলোকচিত্র ধারণ, ফরেনসিক ম্যাপিং, ডিএনএ সংরক্ষণ, টক্সিকোলজি পরীক্ষা এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ণয়ের জন্য পেশাদার ময়নাতদন্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
উপদেষ্টা বলেন, এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরিবারগুলোর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। তিনি জানান, শনাক্ত ৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে ডিএনএ মিল, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, ফরেনসিক প্রমাণ এবং পারিপার্শ্বিক তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে। আরও একজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
শনাক্ত ৮ শহীদ হলেন—ময়মনসিংহের ফুলপুরের মো. মাহিন মিয়া (২৫), শেরপুরের শ্রীবরদীর আসাদুল্লাহ (২৩), চাঁদপুরের মতলবের পারভেজ বেপারী (২৪), পিরোজপুরের নাজিরপুরের রফিকুল ইসলাম (২৫), মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের মো. সোহেল রানা (২৯), ফেনী সদরের রফিকুল ইসলাম (৩০), কুমিল্লার দেবিদ্বারের ফয়সাল সরকার (৩৫) এবং ঢাকার মুগদা এলাকার কাবিল হোসেন (৫১)।
ব্রিফিংয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, শনাক্তকরণের ফলে পরিবারগুলো অন্তত জানতে পারছে তাঁদের প্রিয়জন কোথায় শায়িত আছেন এবং তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল। এটি পরিবার ও জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সান্ত্বনা।
সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ জানান, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম দাফন করা ১১৪টি মরদেহের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং তার মধ্য থেকে ৮ জনকে ডিএনএ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তকালে একসঙ্গে এত সংখ্যক মরদেহ উত্তোলনের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। পরীক্ষার সময় অনেক মরদেহের শরীরে বুলেটের পিলেট এবং গুলির আঘাতের ফরেনসিক চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। তবে ১১৪ জনের মধ্যে কেবল জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় মৃত্যুবরণকারীই নন, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির মরদেহও ছিল।
ফরেনসিক টিম উত্তোলন করা মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে জাতীয় ডাটাবেসে সংরক্ষণ করেছে, যাতে ভবিষ্যতে স্বজনদের দাবি ও পরিচয় যাচাই সহজতর হয়। মিনেসোটা প্রটোকল অনুযায়ী, শনাক্তকরণ শেষে মরদেহগুলোকে সম্মানজনকভাবে পুনরায় দাফন করা হয় এবং পরিচয় নিশ্চিত হওয়া কবরগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম অনুষ্ঠানে বলেন, ফরেনসিক কার্যক্রমটি ছিল পরিকল্পিত, বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে সম্পন্ন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত–পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণ একটি রাষ্ট্রীয় ফরেনসিক ব্যবস্থার সক্ষমতা, মানবাধিকার–সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। মিনেসোটা প্রটোকল মূলত বিচার–বহির্ভূত হত্যা, সংঘাত, গণকবর, রাজনৈতিক সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মরদেহ উত্তোলন ও তদন্তে জাতিসংঘের নির্ধারিত সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ প্রটোকলে মৃত্যুর কারণ নির্ণয়, মরদেহের মর্যাদা রক্ষা, বৈজ্ঞানিক তথ্য সংরক্ষণ এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী ফরেনসিক শনাক্তকরণ কার্যক্রম ভবিষ্যতে সংঘাত–পরবর্তী বিচার, ডিএনএ সংরক্ষণ নীতি, অজ্ঞাত মরদেহ ব্যবস্থাপনা এবং ফরেনসিক সক্ষমতা–বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। শনাক্ত ৮ শহীদের কবর এখন পরিবারগুলোর কাছে সংরক্ষিত থাকবে এবং তাঁদের পরিচয় জাতীয় শহীদ ডাটাবেসে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।


