আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বেইজিং, ৫ জানুয়ারি ২০২৬—পাকিস্তান ও চীন দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সমন্বয় আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। চীনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের সাম্প্রতিক সফর উপলক্ষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়। সফরকালে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত ইস্যুতে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি), দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, সংযোগ প্রকল্প, বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। উভয় দেশ বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চীন–পাকিস্তান বন্ধুত্বকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব হিসেবে অভিহিত করেছে।
মোহাম্মদ ইসহাক দারের এই সফরকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ ২০২৬ সালে চীন–পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। দুই দেশ এই বার্ষিকীকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে উদযাপন করতে সম্মত হয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৫১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশগুলোর একটি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে স্বীকৃতি দেয়। সেই সময় থেকে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জনগণ–থেকে–জনগণ যোগাযোগ এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে দেশ দুটি ধারাবাহিকভাবে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছে।
ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দার সিপিইসি প্রকল্পের অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলো যৌথভাবে নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০১৩ সালে চালু হওয়া সিপিইসি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প, যা পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দর থেকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চল পর্যন্ত সড়ক, রেল, জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগ অবকাঠামোর একটি সমন্বিত করিডোর তৈরি করছে। প্রকল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানে জ্বালানি–উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাণিজ্য সক্ষমতা সম্প্রসারণ ঘটেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক দক্ষতা, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং আঞ্চলিক ভূ–রাজনৈতিক চাপ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত।
সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠকে রাজনৈতিক–দলীয় কূটনীতি, আন্তঃসরকার ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান সহযোগিতা, নীতিগত বিনিময় এবং নেতৃত্ব পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধি বিষয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দার চীনের ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির চতুর্থ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সফল আয়োজনের প্রশংসা করেন এবং রাজনৈতিক–দলীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন।
এছাড়া, চীনের নির্বাহী ভাইস প্রিমিয়ার ডিং জুয়েক্সিয়াং এবং চীনা নির্বাহী ভাইস প্রিমিয়ারের কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে পাকিস্তান–চীন কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বৈঠকগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আর্থিক সমন্বয়, শিল্প বিনিয়োগ, বাণিজ্য সহজীকরণ, আঞ্চলিক সংযোগ, নিরাপত্তা কাঠামো, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব এবং নীতি–পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্বিপক্ষীয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাকিস্তান–চীন অংশীদারিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যা দুই দেশের সম্পর্কের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকেই অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্ক শুধু প্রচলিত প্রতিরক্ষা–কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ–দমন কৌশল, গোয়েন্দা–তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা–উৎপাদন খাতেও সম্প্রসারিত হয়েছে।
দুই দেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পারস্পরিক অবস্থানকে সমর্থন দিয়ে আসছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান ইস্যু, আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা–পরিস্থিতি, বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো, উন্নয়ন–সহযোগিতা, জলবায়ু–পরিবর্তন, বৈশ্বিক জ্বালানি–বাজার, বাণিজ্য ভারসাম্য, ঋণ–কূটনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতা–ভারসাম্য ইত্যাদি বিষয়ে উভয় দেশ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে।
চীন পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য–অংশীদার এবং পাকিস্তানও বিআরআই–এর মাধ্যমে চীনের আঞ্চলিক সংযোগ–কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। যদিও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য–ঘাটতি, মুদ্রা–বিনিময় সমন্বয়, বাজার–প্রবেশ সহজীকরণ, শুল্ক কাঠামো, শিল্প–উৎপাদন সক্ষমতার ভারসাম্য, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগ–নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে নীতিগত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তথাপি দুই পক্ষ বাণিজ্য–সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে আরও গভীর সহযোগিতার আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেছে।
৭৫তম কূটনৈতিক বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে দুই দেশ সাংস্কৃতিক বিনিময়, উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর, যৌথ অর্থনৈতিক সংলাপ, নীতি–সমন্বয় কর্মসূচি, কূটনৈতিক উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং জনগণ–থেকে–জনগণ যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ শুধু প্রতীকী উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণেও ভূমিকা রাখবে।
সফর–পরবর্তী বিবৃতিতে উভয় দেশ শান্তি, উন্নয়ন, সংযোগ ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।


