আইন আদালত ডেস্ক
সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা অসত্য সংবাদ প্রকাশ বা প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আদালত অবমাননার জন্য আইনানুগ দায়ভার গ্রহণ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের আগে আদালতের নির্ধারিত মিডিয়া ফোকাল পার্সন বা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করায় আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এবং বেঞ্চ বরাদ্দ না পাওয়ায় হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি ছুটিতে গেছেন—এমন তথ্য টিভি স্ক্রলসহ নানা প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ অসত্য ও বিভ্রান্তিকর। এ ধরনের তথ্য প্রচার দেশের সর্বোচ্চ আদালত সম্পর্কে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করে এবং আদালতের সাংবিধানিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম তার মায়ের অসুস্থতার কারণে ছুটি গ্রহণ করেছেন। অপরদিকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফরিদ আহমেদ অসুস্থতাজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি থাকায় সাময়িকভাবে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন না। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এসব ছুটি বা অসুস্থতার ঘটনার সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রচারিত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বা বেঞ্চ বরাদ্দ সংক্রান্ত দাবির কোনো সম্পর্ক নেই।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় কাঠামো অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট হলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত, যার দুটি প্রধান বিভাগ—আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ দ্বারা নির্ধারিত, যেখানে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, তবে দীর্ঘদিনের প্রথা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ফলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার ক্রম বিবেচনা করা হলেও, তা লঙ্ঘন সংক্রান্ত যেকোনো দাবি যাচাই ছাড়া প্রকাশ করা হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
আদালত অবমাননা সংক্রান্ত আইনগত কাঠামোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে আদালত অবমাননা একটি গুরুতর আইনগত বিষয়, যা আদালতের কর্তৃত্ব, মর্যাদা, নিরপেক্ষতা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থাকে বাধাগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন যেকোনো কাজ বা বক্তব্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। আদালত অবমাননা বিষয়ে সরাসরি সুনির্দিষ্ট কোনো পৃথক আইন না থাকলেও, সুপ্রিম কোর্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে অবমাননার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। অতীতে ভুল বা অসত্য তথ্য প্রচারকে আদালত অবমাননার আওতায় বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণের নজিরও রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, যদি গণমাধ্যমকর্মীরা সংশ্লিষ্ট তথ্য আদালতের রেজিস্ট্রি থেকে যাচাই করতেন, তবে ভুল তথ্য প্রচারজনিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। প্রশাসন বলেছে, আদালত সংক্রান্ত অসত্য তথ্য পরিবেশন আদালত অবমাননার শামিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় দায়ভার গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি থেকে তথ্য যাচাইকে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা হিসেবে অনুসরণের জন্য গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আইনগত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশে তথ্যের উৎস ও সত্যতা যাচাই সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি। আদালত একটি সংবেদনশীল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায়, সংবাদে ভুল তথ্য প্রকাশের প্রভাব রাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিচারিক প্রক্রিয়া ও জনআস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বিশেষত বিচারপতিদের ছুটি, অসুস্থতা, নিয়োগ, পদোন্নতি বা বেঞ্চ গঠন সংক্রান্ত সংবাদে কোনো ভুল তথ্য প্রচার হলে তা জনপরিসরে আইনি বিভ্রান্তি, সাংবিধানিক বিতর্ক ও আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য যাচাই কাঠামোর গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। এতে আদালত সংক্রান্ত তথ্য পরিবেশনে দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড আরও কঠোরভাবে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে এ নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আদালত সম্পর্কে জনমনে ভুল ধারণা তৈরি বা আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের ঝুঁকি কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


