ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রা পতনের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ ঊর্ধ্বগতি পেয়েছে

ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রা পতনের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ ঊর্ধ্বগতি পেয়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মুদ্রার রেকর্ড পতনের প্রতিক্রিয়ায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ প্রতিবাদ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে এবং দেশটির অনেক অঞ্চলে সংঘর্ষ ও মানবিক ব্যাহত পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। প্রতিবাদকারীরা মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি প্রস্তাবিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিও তুলছেন, যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও প্রবল করেছে।

বিক্ষোভের সূচনা গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বড় বাণিজ্যিক এলাকা ও গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদারদের ধর্মঘট ও প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে হয়। সেই থেকে অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রা রেটের পতনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিয়মিতভাবে জানাচ্ছে যে বিক্ষোভ এখন দেশের প্রায় সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অন্তত ২৬টি প্রদেশে লাখ লাখ মানুষ এতে অংশ নিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) গত এক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভের কারণে অনেক শহরে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ২০ জনের বেশি হতাহত হয়েছে এবং প্রায় হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। যদিও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী নিহত ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য আছে, সর্বজনীন তথ্য প্রতীয়মান করে unrest ব্যাপক ও তীব্র।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। সংঘর্ষ ও সহিংসতার কারণে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে এবং অনেককে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভের মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে ইরানের অর্থনীতির ক্রমাগত অবনতি ও মুদ্রার পতনকে নির্দেশ করা হচ্ছে। ইরানি রিয়াল বছরের শেষদিকে ডলারের বিপরীতে রেকর্ড নিম্ন মানে পৌঁছেছে, যার ফলে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত ও জনজীবনে ব্যয় বেড়ে গেছে। মুদ্রার পতনের কারণে বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া স্তরে পৌঁছেছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

এই আর্থিক সংকটের পেছনে বহু বছর ধরে চলমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্নতা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের বিরোধী পদক্ষেপ ও স্ন্যাপব্যাক নিষেধাজ্ঞার পুনরায় প্রবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া মার্কিন ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা ইরানের অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক অসন্তোষ দ্রুত রাজনৈতিক দাবি ও বিরোধে রূপ নিয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করছেন এবং কিছু জায়গায় রাজনৈতিক সংস্কার বা পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। এতে সরকার বিরোধী স্লোগান ও সমাবেশের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমাতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও অন্যান্য জনসংযোগ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। সরকারি পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করা হয়েছে, তবে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও দেখা যায়নি।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন যে এই বিক্ষোভ ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এবং সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে বড় রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে রূপ নিতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন নেতা বলেছেন, যদি সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন, তাহলে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দিতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের বর্তমান সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক এক বিস্তৃত অস্থিরতা যা সময়ের সাথে আরও জটিল রূপ নিতে পারে। নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি আরও জোরদার হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কী দিকে যাবে তা আন্তর্জাতিক পরিবেশক ও অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যম নিরীক্ষণ করছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ