আইন আদালত ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কারফিউ জারি, আন্দোলনকারীদের দমনে সহিংসতার উস্কানি প্রদান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন বিষয়ে আদেশ আগামী ১২ জানুয়ারি ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এই তারিখ ধার্য করেছেন।
আজ (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ প্রসিকিউশনের অভিযোগ গঠন চেয়ে করা আবেদন এবং আসামিপক্ষের অব্যাহতি চেয়ে দাখিলকৃত পৃথক আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদেশ ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন। শুনানিতে আসামিপক্ষে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী এবং প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সংঘটিত সহিংসতার পেছনে আসামিদের ভূমিকা ছিল নির্দেশনামূলক ও উস্কানিদানকারী। বিশেষ করে কারফিউ চলাকালে আন্দোলনকারীদের ‘শেষ করে দিতে হবে’— এমন বক্তব্য তারা ফোনালাপে দিয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই ফোনালাপের পর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের একাধিক স্থানে আন্দোলনকারী ছাত্র ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয় এবং অসংখ্য প্রাণহানি ঘটে। আসামিদের বক্তব্য ওই হত্যাকাণ্ডগুলোতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উস্কানি হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।
গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক ধারা, গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতন, অবৈধ কারফিউ জারির মাধ্যমে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন এবং সহিংসতা সংঘটনে প্ররোচনা প্রদানের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ ওই অভিযোগ আমলে নেন এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০ জুলাই ২০২৪ থেকে কয়েক দফায় কারফিউ জারি করা হয়। এ সময় ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, কারফিউ চলাকালে আন্দোলনকারীদের দমনে যে সহিংস অভিযান পরিচালিত হয়, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, জেনেভা কনভেনশন, জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ‘চূড়ান্তভাবে দমন’ করার যে বক্তব্য পাওয়া গেছে, তা রাষ্ট্রীয় শক্তিকে অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগে উৎসাহ জুগিয়েছে। এই বক্তব্যের পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, যশোর ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ, আটক ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে। প্রসিকিউশন দাবি করেছে, এই প্ররোচনামূলক বক্তব্য আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা পরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্রপক্ষের তদন্তে আসামিদের ফোনালাপের ডিজিটাল আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, নিহত ও আহতদের পরিবার এবং আন্দোলনকালে উপস্থিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ, আসামিদের নির্দেশনামূলক ভূমিকা এবং পরবর্তী সহিংসতার ধারাবাহিকতা যাচাই করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অধীনে ‘ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ এবং ‘ইনসাইটমেন্ট টু জেনোসাইড’— এর মতো গুরুতর ধারার আওতায় বিচারযোগ্য।
অন্যদিকে, শুনানিতে আসামিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযুক্ত ফোনালাপের বক্তব্য প্রসঙ্গবিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বা হত্যাকাণ্ডে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না। আসামিপক্ষ আরও দাবি করেন, আন্দোলন চলাকালে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছে, যা আইনি মানদণ্ডে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে উস্কানি’ হিসেবে গণ্য করার মতো উপাদান বহন করে না। এছাড়া তারা কারফিউ জারি বা আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো অবৈধ নির্দেশ দিয়েছেন— এমন অভিযোগও নাকচ করেন এবং অব্যাহতি প্রদানের আবেদন জানান।
প্রসিকিউশন পক্ষ শুনানিতে অভিযোগ গঠনের আবেদন সমর্থন করে বলেন, মামলার তদন্তে সংগৃহীত আলামত ও সাক্ষ্য আসামিদের বক্তব্যের উস্কানিদানকারী চরিত্র এবং সহিংসতা সংঘটনে তার প্রভাব স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ধারাবাহিকতায় এই বক্তব্যের পরোক্ষ প্রভাব বিচারিক মানদণ্ডে বিবেচনার জন্য যথেষ্ট বলে তারা দাবি করেন।
আসামি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে ১৩ আগস্ট ২০২৫ সালে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর থেকে তারা কারাগারে আছেন এবং এ মামলায় জামিনের আবেদন নাকচ হওয়ায় কারাবন্দি অবস্থায় বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উচ্চপর্যায়ের সরকারি নীতি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠবে বলে আইন–বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ১২ জানুয়ারি ঘোষিত আদেশে অভিযোগ গঠন বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে এবং অভিযোগ গঠিত হলে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। অভিযোগ গঠন না হলে প্রসিকিউশনের আবেদন পুনর্বিবেচনা বা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সুযোগ থাকবে। আদেশ ঘোষণার পর মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।


