জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানে উদ্যোগ: নৌ উপদেষ্টার বক্তব্য

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থানে উদ্যোগ: নৌ উপদেষ্টার বক্তব্য

বাংলাদেশ ডেস্ক

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ও রক্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) সচিবালয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যে সরকারই দায়িত্ব নিক, জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁদের ত্যাগ যেন অস্বীকার বা অবমূল্যায়ন না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সচেতনতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে।

উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, হতাহতের পরিসংখ্যান, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা, আন্দোলনের সময় তাঁর অবস্থান, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও আহত আন্দোলনকারীদের কর্মসংস্থানে নেওয়া উদ্যোগ।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন শুরু হয় কোটা সংস্কারসহ একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিকে কেন্দ্র করে, যা পরবর্তী সময়ে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ওই বছরের জুলাইয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণেও ওই সময়ে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে উঠে এসেছে, যদিও সরকারি–বেসরকারি উৎসভেদে পরিসংখ্যানে তারতম্য রয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ৪ আগস্ট ২০২৪-এ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং আইনগত কাঠামো ও সামরিক বিধিমালায় ‘অবৈধ আদেশ’ না মানার অধিকার রয়েছে—সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, তিনি ৪ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি সামরিক বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, সামরিক বাহিনী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং সংবিধান ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে; ফলে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গুলি চালানো বা প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ সামরিক বাহিনীর পেশাগত নীতি ও আইনি কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও মুক্তিযুদ্ধের সাবেক সেনা–কর্মকর্তারাও একই সুরে বক্তব্য দেন।

উপদেষ্টার ভাষ্যমতে, ওই সংবাদ সম্মেলনের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় সামরিক বাহিনীর কৌশলগত অবস্থানে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এবং ৬ আগস্ট ঘোষিত কারফিউ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ৫ আগস্ট ২০২৪-এ এক দিন এগিয়ে আনা হয়। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর সিদ্ধান্ত–প্রক্রিয়া, মাঠপর্যায়ের নির্দেশনা এবং কারফিউ পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বহুস্তরীয় প্রভাবক কাজ করেছিল বলে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।

৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ত্যাগ করেন। এর পর ৮ আগস্ট ২০২৪-এ নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ওই সরকারে নৌ পরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিনগুলোতে উপদেষ্টা কিছু সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে তিনি একাধিক হাসপাতালে গিয়ে জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এর মধ্যে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়ে আহতদের চিকিৎসা–ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন–পরিকল্পনা এবং মানসিক–সামাজিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করেন।

উপদেষ্টা জানান, আহত ও কর্মক্ষম আন্দোলনকারীদের কর্মসংস্থানে তাঁর অধীন দুই মন্ত্রণালয় থেকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে নৌ পরিবহন খাতে চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, নৌ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসি-সহ নৌ–সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোতে যোগ্যতা ও সক্ষমতা যাচাই করে পর্যায়ক্রমে আহত আন্দোলনকারীদের নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরসহ একাধিক সংস্থায় ইতোমধ্যে আন্দোলনে আহত কিছুসংখ্যক কর্মক্ষম ব্যক্তিকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবে নিয়োগ–প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বিধি, নিরাপত্তা যাচাই, যোগ্যতা মূল্যায়ন এবং কোটা–নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নামকরণের উদ্যোগের কথাও জানান উপদেষ্টা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহীদ আন্দোলনকারী ওসমান হাদীর স্মৃতি সংরক্ষণে ঝালকাঠি জেলার নলছিটিতে একটি লঞ্চঘাটের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ ওসমান হাদী লঞ্চঘাট, নলছিটি’ এবং ভোলা জেলায় একটি নৌ–স্পিডবোটের নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। স্মৃতি সংরক্ষণে অবকাঠামোর নামকরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক–সামাজিক ইতিহাসে প্রচলিত পুনর্বাসন ও স্মরণ–সংস্কৃতির অংশ, যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রস্তাবনার ভিত্তিতে নামকরণ সম্পন্ন হয়ে থাকে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, তিনি দীর্ঘদিন নিরাপত্তা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে লেখালেখি ও গণমাধ্যম আলোচনায় যুক্ত ছিলেন এবং অতীতেও সামাজিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক কাঠামো, নিরাপত্তা–ঝুঁকি ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রসঙ্গে বক্তব্য দিয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের সময় রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত সংকট, রাজনৈতিক মেরুকরণ, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর আলোচনা–সমালোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী মোড় তৈরি করেছে, যার প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্কার–পরিকল্পনা, নিরাপত্তা বাহিনীর বেসামরিক–সম্পৃক্ততার নীতি, জন–প্রত্যাশা, রাজনৈতিক আস্থা এবং পুনর্বাসন–ব্যবস্থাপনায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের পরবর্তী সময়ে নৌ–খাতে নিয়োগ, স্মৃতি সংরক্ষণ, পুনর্বাসন–প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের উদ্যোগগুলো রাষ্ট্রীয় দপ্তর–সংস্থার বিধি ও নীতি কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়েছে এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে চলমান রয়েছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ