আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম চলতি বছরের মধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর অথবা টানা দুই মেয়াদে সীমিত করার লক্ষ্যে সংসদে একটি বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রী, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও শীর্ষ সরকারি প্রতিনিধিদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, দীর্ঘসময় ক্ষমতায় অবস্থান করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাঁর মতে, নেতৃত্বের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করে এবং ক্ষমতার পালাবদলকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের ওপর সাংবিধানিক কোনো সময়সীমা নেই। ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় কাঠামোয় পরিচালিত দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ভর করে মূলত সংসদের নিম্নকক্ষ দেউয়ান রাকিয়াতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর। ফলে কোনো নেতা যদি টানা সংসদীয় আস্থাভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারেন, তাত্ত্বিকভাবে তিনি দীর্ঘসময় পদে থাকতে পারেন। এই কাঠামোর সমালোচনায় আনোয়ার বলেন, ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী কেন্দ্রীভবন নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব বাড়িয়ে তোলে—যা গণতন্ত্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।
নতুন বছর উপলক্ষে দেওয়া ঘোষণায় আনোয়ার ইব্রাহিম উল্লেখ করেন, নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নেতৃত্ব পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট পাকাতান হারাপান তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি শাসনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্ট একটি কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাব, যার লক্ষ্য রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি শাসনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি টানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সরকারপ্রধানের মেয়াদ হিসেবে চিহ্নিত। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অবসর ভেঙে তিনি পুনরায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন। ৯২ বছর বয়সে শপথ গ্রহণ করে তিনি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়েন। মাহাথিরের দ্বিতীয় দফার শাসন অবশ্য ২০২০ সালে রাজনৈতিক জোটের অভ্যন্তরীণ সমর্থন হারানোর পর শেষ হয়। দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের এই অভিজ্ঞতা মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ককে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় কোনো পদই সময়সীমার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। তাঁর ভাষ্যমতে, নেতৃত্বের মেয়াদ নির্দিষ্ট করা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নীতিগত ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যেও একটি সুষম ভারসাম্য তৈরি করতে সহায়তা করে। তবে প্রস্তাবিত বিলটি ঠিক কবে সংসদে উত্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সময় জানাননি। জানা গেছে, চলতি মাসেই সংসদের এ বছরের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এই বিলটি আলোচনার টেবিলে আসতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
মেয়াদসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের পাশাপাশি আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, সরকার সংসদে তথ্য অধিকার আইন উত্থাপনের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করেছে। তাঁর মতে, তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ, নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার গণতন্ত্রের মূল শর্ত। তিনি বলেন, সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এবং নীতিগত জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে। এই উদ্যোগকে দেশটির শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আইনি কাঠামোগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, মালয়েশিয়ার বিচারিক প্রক্রিয়ায় চলমান দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানও আলোচনায় রয়েছে। গত মাসে দেশটির হাইকোর্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ১এমডিবি আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি মামলায় অতিরিক্ত ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। আদালতের রায় অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি যে ছয় বছরের সাজা ভোগ করছেন, সেটি শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত এই সাজা কার্যকর হবে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ১এমডিবি (ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ) তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। ২০২০ সালে প্রথম দফায় ১২ বছরের কারাদণ্ড পেলেও আপিল ও আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা পুনর্বিবেচনা শেষে কিছু সাজা কমিয়ে আনা হয়, যার ধারাবাহিকতায় তিনি বর্তমানে ছয় বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী পদে সময়সীমা নির্ধারণের উদ্যোগকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সম্ভাব্য নতুন সংস্কার ধারা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক জোটভিত্তিক শাসন কাঠামো এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে আনোয়ারের প্রস্তাব রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই বিল পাস হলে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব কাঠামোতে নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর, প্রাতিষ্ঠানিক শাসন কাঠামোর শক্তি বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।


