অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ঢাকা, ৬ জানুয়ারি ২০২৬: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য কিংবা সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে পড়বে না বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। সভায় সরকারি ক্রয় পরিকল্পনা, আমদানি–রপ্তানি সংশ্লিষ্ট নীতিগত সমন্বয় এবং বৈদেশিক সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ভারত–বাংলাদেশ উত্তেজনার সূচনা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হয়নি এবং চলমান টানাপড়েন আবেগপ্রসূত হলেও তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করবে না। তিনি স্পষ্ট করেন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক, আন্তঃসীমান্ত লেনদেন, আমদানি–রপ্তানি নিষ্পত্তি, এলসি কার্যক্রম, সরবরাহ চেইন কিংবা সরকারি ক্রয়—এসব ক্ষেত্রে কোনো ব্যাঘাতের লক্ষণ নেই। বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, রিজার্ভ, নিত্যপণ্য আমদানি কিংবা উৎপাদন–বিপণন কাঠামোয়ও কোনো অস্থিরতার পূর্বাভাস নেই বলে জানান তিনি।
সভা-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে অর্থ উপদেষ্টা মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ক্রিকেট লিগে অংশগ্রহণ ও পরবর্তী সিদ্ধান্তগত জটিলতার প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন খেলোয়াড়কে পূর্ব আহ্বান জানিয়ে পরে আকস্মিকভাবে অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলোয়াড় নির্বাচন কিংবা অংশগ্রহণ দয়া–দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, এটি পেশাগত দক্ষতা ও পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত পেশাগত ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তবে তিনি একইসঙ্গে পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ক্রীড়া ইস্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা রাজনৈতিক–কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার বিষয় হলেও অর্থনীতি ও বাণিজ্যে এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব নেই।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক আবেগ কাজ করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দুই পক্ষই বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং কূটনৈতিক–রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে উভয় দেশের দায়িত্বশীল মহল কাজ করবে। অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে তা আন্তর্জাতিক পেশাদার ক্রীড়া নীতির আলোকে যৌক্তিক ছিল, কারণ কোনো সিদ্ধান্ত একতরফা হলে তার প্রতিক্রিয়া আসা স্বাভাবিক।
সভায় উপস্থিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা পৃথক বক্তব্যে বলেন, খেলোয়াড় প্রত্যাহার ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ভেন্যু পরিবর্তনের মতো ইস্যুগুলোতে ‘ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়া’ তত্ত্ব কাজ করেছে, তবে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক–বাণিজ্যিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখাই দুই দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ভারতীয় সংসদের একাধিক সদস্যও এ ধরনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয়—দায়িত্বশীল পর্যায়ে বিষয়টি ইতোমধ্যে পুনর্বিবেচনার আলোচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারত অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এবং আমদানি প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার। প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তুলা, সুতা, কাঁচামাল, রাসায়নিক, মেশিনারি যন্ত্রাংশ, চাল, চিনি, পেঁয়াজ, আদা–রসুন, গবাদিপশুর খাদ্য, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট। অন্যদিকে রপ্তানিতে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী, সিরামিক, হিমায়িত মাছ, প্লাস্টিক পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্য।
কূটনৈতিক উত্তেজনা বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন ধারণা অনেক ক্ষেত্রে আলোচনায় থাকলেও অর্থ উপদেষ্টা জানান, বাণিজ্যিক কাঠামো এখন নীতিনির্ভর, চুক্তিভিত্তিক এবং বহুস্তরীয় সরবরাহ চেইন ও আর্থিক নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় তা রাজনৈতিক আবেগের তাৎক্ষণিক অভিঘাত থেকে সুরক্ষিত। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক চালু রাখতে উভয় দেশে ব্যবসায়ী, আমদানি–রপ্তানিকারক সংগঠন, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক চুক্তি কাঠামো কাজ করছে, ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার সুযোগ সীমিত।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, নিত্যপণ্য সরবরাহে বিকল্প বাজার সংযোগ, রপ্তানি–পণ্য বৈচিত্র্য, বৈদেশিক বাণিজ্যে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি এবং ক্রস–বর্ডার পেমেন্ট সিস্টেম ডিজিটালাইজেশনের দিকে জোর দিয়েছে। এর ফলে একক কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অস্থিরতা তৈরি হলেও তা সামগ্রিক বাণিজ্য–বাস্তবতায় সংকট তৈরি করার সক্ষমতা রাখে না। বিশেষ করে নিত্যপণ্য আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্য, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, রাশিয়া, তুরস্ক এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য–সংযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, যা সরবরাহ ঝুঁকি কমিয়েছে।
এদিকে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত সভায় আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণ, বৈদেশিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে চলমান চুক্তি, এলসি নিষ্পত্তি, পণ্য পরিবহন সময়সূচি, জ্বালানি–বিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানির অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক মূল্য–অস্থিরতার মধ্যে ক্রয় পরিকল্পনার স্থিতিশীলতা—এসব বিষয়ে নীতিগত পর্যালোচনা হয়। উপদেষ্টা পরিষদ জানায়, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে চুক্তি–নিয়ম ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ায় তা রাজনৈতিক ইস্যুর দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই।
সচিবালয় সূত্র জানায়, সভায় আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ চেইন, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, বন্দর ব্যবস্থাপনা, স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য–সুবিধা অব্যাহত রাখা, ট্রানজিট–সহযোগিতা, আমদানি–পণ্যের শুল্ক কাঠামো, মূল্য স্থিতিশীলতা, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা—এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা আসে। উপদেষ্টা পরিষদ মনে করে, আঞ্চলিক কূটনৈতিক–রাজনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক–অর্থনৈতিক ভিত্তি যথেষ্ট স্থিতিশীল, বৈচিত্র্যময় এবং বহুস্তরীয় কাঠামোয় পরিচালিত হওয়ায় চলমান উত্তেজনায় অর্থনীতি বা বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যবসা ও অর্থনীতি কোনো আবেগনির্ভর খাত নয়, এটি নীতিনির্ভর খাত। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্তেজনা থাকলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থিতিশীল রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।


