ভেনেজুয়েলা‘তে ডেলসি রদ্রিগেজের শপথ ও মাদুরো ও স্ত্রীর মামলা কার্যক্রম শুরু

 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেলসি রদ্রিগেজ শপথ গ্রহণ করেছেন। দেশটির জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) এর বার্ষিক অধিবেশনে রদ্রিগেজ আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন, যা নতুন বছরের আইনসভা কার্যক্রমের সূচনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগে হাজির করা হয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে, যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও আইনি মহলে বহুমাত্রিক প্রভাব সৃষ্টি করছে।

রদ্রিগেজ তার শপথ গ্রহণ ভাষণে বলেন, দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশ্রীতা দেখা দিয়েছে, তার পেছনে অবৈধ সামরিক আগ্রাসন রয়েছে এবং তিনি জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণের সময় দেশটির জাতীয় পরিষদের আইনপ্রণেতারা উপস্থিত ছিলেন এবং অনুষ্ঠানটি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হয়।

ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের। নিকোলাস মাদুরো ২০১৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে বিতর্ক ও বিরোধ আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিবাদমান দেশগুলো মাদুরোর প্রশাসনকে বৈধ রাষ্ট্রক্ষমতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং অনেক সময় মাদুরো প্রশাসনকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক দুর্নীতির জন্য দায়ী করে থাকে। এর ফলে ২০১৯ সালে মাদুরো বিরোধী নেতাদের একটি অংশ জোরালোভাবে বিরোধিতা করে এবং গুইদোকে স্ব-ঘোষিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু শাসন ব্যবস্থায় মাদুরো ও তার অনুগত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকায় রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত ছিল।

জাতীয় পরিষদে রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণ মাদুরোর প্রশাসনের কার্যকারিতা ও বৈধতার প্রশ্নকে আরও জটিল পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো রদ্রিগেজকে সমর্থন জানিয়েছে, যেখানে অনেক ব্রিক দেশ ও মাদুরোর নিয়ন্ত্রিত শাসন পক্ষের দেশগুলো তা স্বীকৃতি দেয়নি। এর ফলে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আন্তর্জাতিক মর্যাদা, তেলের বাজার, ঋণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে।

একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান সংক্রান্ত অভিযোগে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত ৮টায় নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপব্যবহার, মাদক পাচার ও উন্নত অস্ত্রচোরাচালান সংক্রান্ত অভিযোগ এনেছে।

আদালতে ব্যক্তিগতভাবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মাদুরো দাবি করেন, তিনি নির্দোষ ও সৎ ব্যক্তি এবং এখনও তিনি তার দেশের প্রেসিডেন্ট। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে কয়েদিদের মতো পোশাকে আনা হয় এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। আদালতে হাজির হওয়া পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে।

মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগে বলা হয়েছে যে, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বড় একটি নেটওয়ার্ক ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে। অভিযোগে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, মাদুরো পরিবার ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এই কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত। অভিযোগের ভিত্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) সহ অন্যান্য ফেডারেল সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছে।

মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা বরখাস্তের দাবিতেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিরোধীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া যত কঠিন হোক, তা অবশ্যই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। অন্যদিকে, মাদুরোর সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও আখ্যায়িত করেছেন।

ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও আইনি এই জটিলতায় তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশটি তেল-সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্ভিক্ষ ও জনহীনতা মোকাবিলা করছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রশ্ন সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণ ও মাদুরো পরিবারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা একই সময়ে দেশটিতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিভাজন আরও বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও এখান থেকে নতুন করে mould হতে পারে, যা ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্ব সম্পর্কের গতিধারাকে প্রভাবিত করবে।

এই পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, এবং ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে তা কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ