জাতীয় ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে ভোটার স্থানান্তরের প্রবণতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ৭ লাখ ১ হাজার ৩৩৭ জন ভোটার তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৫ জনের আবেদন অনুমোদন পেয়েছে। এক বছরে এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের এলাকা পরিবর্তন দেশের ৫৪ বছরের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত ভোটার স্থানান্তরের পরিসংখ্যান প্রশাসনিক অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০টি অঞ্চলের মধ্যে ঢাকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ভোটার স্থানান্তর হয়েছে। এই অঞ্চলে ৮৬ হাজার ৮২৫ জন ভোটার তাদের নিবন্ধিত এলাকা পরিবর্তন করেছেন, যা অন্য সব অঞ্চলের তুলনায় শীর্ষে। রাজধানী ও আশপাশের জেলা-উপজেলাগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীভূত অবস্থান এবং আবাসন পরিবর্তনের প্রবণতার কারণে এই সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বেশি বলে উল্লেখ করেছে কমিশন।
এত সংখ্যক আবেদন ও অনুমোদনের প্রেক্ষাপটে ভোটার স্থানান্তরের নথিপত্র পর্যালোচনা করে কমিশন জানিয়েছে, আবেদনকারীদের বড় অংশই স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের বৈধ প্রমাণ, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন সংক্রান্ত তথ্য, আবাসন পরিবর্তনের দলিল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র, বাড়ি ভাড়া চুক্তি বা কর্মস্থলের সনদ সংযুক্ত করেছেন। কমিশনের মতে, প্রচলিত আইনে নাগরিকদের ভোটার এলাকা পরিবর্তনের পূর্ণ সুযোগ রয়েছে এবং প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় যাচাই-বাছাই, আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তদন্ত, খসড়া তালিকা প্রকাশ, আপত্তি নিষ্পত্তি এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে।
তবে ভোটার স্থানান্তরের এই হার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা এ প্রক্রিয়ার সময়, সংখ্যা এবং ভৌগোলিক বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিছু দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সময়ে এত বিপুলসংখ্যক আবেদন ও অনুমোদন নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের কৌশল কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আবার অন্য পক্ষ এটিকে নাগরিক অধিকার ও জনমিতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছে।
ইসি জানিয়েছে, স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তারা কোনো দল, গোষ্ঠী বা নির্বাচনী প্রার্থী বিবেচনায় নেয় না; বরং আবেদনকারীর ঠিকানা, ভোটারযোগ্যতা, তথ্যের যথার্থতা এবং আইনি প্রমাণই অনুমোদনের একমাত্র ভিত্তি। কমিশনের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন অংশে শিল্পাঞ্চল, নগরায়ণ, অভ্যন্তরীণ শ্রম-অভিবাসন, প্রবাসফেরত নাগরিকদের পুনর্বাসন, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থল পরিবর্তন, পারিবারিক স্থানান্তর, বিয়ের পর ঠিকানা বদল, জমি-ফ্ল্যাট ক্রয় এবং স্থায়ীভাবে অন্য এলাকায় বসবাসের কারণে নাগরিকরা ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। কমিশন আরও জানায়, অনেক নাগরিক আগের ঠিকানায় ভোটার থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস না করায় তারা স্থায়ী বা বাস্তব বসবাসস্থল অনুযায়ী নিবন্ধন সংশোধন করেছেন, যা নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতার জন্য ইতিবাচক।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। মোট ভোটারের তুলনায় এক বছরে অনুমোদিত স্থানান্তর ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৫ জন, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ০.৫২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতীয় ভোটার সংখ্যার তুলনায় এটি অপেক্ষাকৃত ছোট অংশ হলেও, নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক সমীকরণে নির্দিষ্ট কিছু আসনে এই পরিবর্তন প্রার্থী ও দলের ভোটের বণ্টনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে জনমিতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা ‘মার্জিনাল সিট’—যেখানে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান সাধারণত কম—সেসব আসনে স্থানান্তরিত ভোটারদের উপস্থিতি ফলাফলের ব্যবধান বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটার স্থানান্তর প্রক্রিয়া আইনসম্মত হলেও নির্বাচনকালীন সময়ে নাগরিকদের ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন ও অনুমোদনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং মাঠ পর্যায়ের তদন্তের মান নিয়ে জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দেয়। তাদের মতে, নির্বাচন ব্যবস্থায় নাগরিক অংশগ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে প্রক্রিয়ার যাচাই আরও কঠোর, সময়ভিত্তিক প্রবণতার ব্যাখ্যা আরও তথ্যসমৃদ্ধ এবং অঞ্চলভিত্তিক বণ্টনের কারণগুলো আরও উপাত্তনির্ভর উপস্থাপন করলে জনআস্থা বাড়বে।
ইসি সূত্রে আরও জানা যায়, নির্বাচন ঘোষণার পর ভোটার তালিকার চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশের আগ পর্যন্ত স্থানান্তরের আবেদন গ্রহণ, যাচাই ও অনুমোদন অব্যাহত থাকবে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর কোনো ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না এবং তালিকা অনুযায়ীই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে।
জাতীয় নির্বাচনে ভোটার তালিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। ফলে নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের এই রেকর্ড প্রবণতা জাতীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হলেও, ইসি এটিকে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় স্থানান্তরিত ভোটারদের উপস্থিতি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটের ব্যবধানের সমীকরণে কী মাত্রায় ভূমিকা রাখে, তা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ এবং ভোটের ফলাফলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।


