মনোনয়নপত্র বাতিল–গ্রহণাদেশের বিরুদ্ধে ইসিতে দুই দিনে ৭২ আপিল

মনোনয়নপত্র বাতিল–গ্রহণাদেশের বিরুদ্ধে ইসিতে দুই দিনে ৭২ আপিল

আইন আদালত ডেস্ক

ঢাকা, ৬ জানুয়ারি ২০২৬: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল দায়ের কার্যক্রম দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ভবনের আপিল দায়ের কেন্দ্রে অঞ্চলভিত্তিক ১০টি বুথে এই কার্যক্রম শুরু হয়। কমিশনের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সোমবার প্রথম দিনে মনোনয়নপত্র বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে ৪১টি এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের আদেশের বিরুদ্ধে ১টি আপিল দায়ের করা হয়। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত দুই দিনে মোট ৭২টি আপিল দায়ের হয়েছে।

ইসির আপিল দায়ের কেন্দ্রটি নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনের খোলা প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক বুথগুলোতে প্রার্থীদের পাশাপাশি সংক্ষুব্ধ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিরাও আপিল জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কমিশনের নোটিশ অনুযায়ী, রিটার্নিং অফিসারের আদেশে সংক্ষুব্ধ কোনো প্রার্থী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরবর্তী পাঁচ দিনের মধ্যে কমিশন বরাবর মেমোরেন্ডাম আকারে আপিল দায়ের করতে পারবেন। আপিলের মূল কাগজপত্র ১ সেট ও ৬ সেট ছায়ালিপিসহ জমা দিতে হবে।

গত ৪ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিনে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র যাচাই করেন রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা। যাচাই শেষে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ৭২৩ জনের প্রার্থীতা বাতিল করা হয়। যাচাই প্রক্রিয়ায় বাতিল ঘোষণার হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আপিল কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সাড়া পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন। বাংলাদেশে নির্বাচনী আইনে আপিলের বিধানটি প্রার্থীদের প্রার্থীতা সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রতিকার, যা নির্বাচনের আগেই সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াকে আইনগত ভিত্তি দেয়।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) প্রথম দিনে খুলনা অঞ্চল থেকে ৩টি, রাজশাহী অঞ্চল থেকে ৫টি, রংপুর অঞ্চল থেকে ৩টি, চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে ২টি, কুমিল্লা অঞ্চল থেকে ৫টি, ঢাকা অঞ্চল থেকে ১৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে ১টি, বরিশাল অঞ্চল থেকে ১টি এবং ফরিদপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ৭টি আপিল দায়ের করা হয়। এর মধ্যে কুমিল্লা অঞ্চল থেকে ১টি আপিল মনোনয়নপত্র গ্রহণের আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে, যা আপিল কার্যক্রমে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার বিরল উদাহরণ।

নির্বাচন কমিশনের নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি বিকাল ৫টা পর্যন্ত আপিল দায়ের করা যাবে। এ সময় সংক্ষুব্ধ পক্ষ নিজে অথবা লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন জমা দিতে পারবেন। আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি পর্যায়টি নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফুল কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগ, যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পূর্ণাঙ্গ কমিশন বেঞ্চ হিসেবে শুনানি গ্রহণ করেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা ও আইনগত ভিত্তি পর্যালোচনা করেন।

আপিল আবেদনগুলোর শুনানি ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে কমিশন ভবনের বেইজমেন্ট-২ এর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শুনানির সময়সূচি আপিল নম্বর অনুসারে ধারাবাহিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে ১ থেকে ৭০ নম্বর আপিলের শুনানি হবে। ১১ জানুয়ারি ৭০ থেকে ১৪০, ১২ জানুয়ারি ১৪১ থেকে ২১০, ১৩ জানুয়ারি ২১১ থেকে ২৮০, ১৪ জানুয়ারি ২৮১ থেকে ৩৫০, ১৫ জানুয়ারি ৩৫১ থেকে ৪২০, ১৬ জানুয়ারি ৪২১ থেকে ৪৯০, ১৭ জানুয়ারি ৪৯১ থেকে ৫৬০ এবং ১৮ জানুয়ারি ৫৬১ নম্বর থেকে অবশিষ্ট সব আপিলের শুনানি গ্রহণ করা হবে।

শুনানি শেষে আপিলের সিদ্ধান্ত একাধিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। কমিশনের নোটিশ অনুযায়ী, সিদ্ধান্তগুলো আপিল দায়ের কেন্দ্রের মনিটরে প্রদর্শন, রায়ের পিডিএফ কপি ই-মেইলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও রিটার্নিং অফিসারদের কাছে পাঠানো এবং কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন ভবনের অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আপিল রায়ের অনুলিপি বিতরণ করা হবে। বিতরণ সূচি অনুযায়ী, ১০, ১১ ও ১২ জানুয়ারির রায়ের অনুলিপি ১২ জানুয়ারি; ১৩, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারির অনুলিপি ১৫ জানুয়ারি এবং ১৬, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারির রায়ের অনুলিপি ১৮ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় আপিল শুনানি একটি সময়-নির্দিষ্ট দ্রুত প্রতিকারমূলক প্রক্রিয়া। শুনানির রায় নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রার্থী তালিকা নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখে। আপিল নিষ্পত্তির পর বৈধ প্রার্থীদের তালিকা গেজেটভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা প্রতীক বরাদ্দ ও প্রচারণা শুরুর পূর্বশর্ত। ফলে আপিল কার্যক্রমটি শুধু প্রার্থীতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগই নয়, বরং নির্বাচনের আইনগত ভিত্তি ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য ধাপ।

ইসি কর্মকর্তাদের ধারণা, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আপিলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। অতীত নির্বাচনগুলোতেও মনোনয়নপত্র বাতিল–গ্রহণ সংক্রান্ত আপিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যেখানে কমিশনের রায়ই প্রার্থীতা সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আইনগত চূড়ান্ততা নির্ধারণ করে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ