মোটরযান চালকসহ পেশাজীবীদের মর্যাদা নিশ্চিতে আইন ও কাঠামোগত সংগঠনের তাগিদ

মোটরযান চালকসহ পেশাজীবীদের মর্যাদা নিশ্চিতে আইন ও কাঠামোগত সংগঠনের তাগিদ

রাজনীতি ডেস্ক

রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, পেশাজীবীদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করতে কাঠামোগত ও লক্ষ্যভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা অপরিহার্য। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরযান চালক দল আয়োজিত ‘সাংগঠনিক কর্মপরিকল্পনা উদ্বোধন’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ আহ্বান জানান।

রিজভী বলেন, “সংগঠন গড়ার লক্ষ্য হতে হবে সংশ্লিষ্ট পেশার মানুষের সামাজিক সম্মান, পেশাগত নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং হয়রানিমুক্ত জীবন নিশ্চিত করা।” তিনি উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র মিছিল-মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক পরিচয়ের নাম ব্যবহার করে সংগঠন তৈরি করার যে প্রবণতা দেশে গড়ে উঠেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে পেশাজীবী শ্রেণির মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, “মিছিল-মিটিং সংগঠনের কার্যক্রমের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটাই সংগঠনের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। সংগঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে পেশাজীবীদের অধিকার ও মর্যাদা।”

বক্তব্যে মোটরযান চালকদের পেশাগত চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই পেশার মানুষ যেন সমাজে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে, পুলিশি হয়রানি ও কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার না হয়— তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে।” তিনি বিশেষভাবে মোটরযান চালকদের জন্য পেশাগত মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট আইন কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। রিজভী বলেন, “মোটরযান চালকরা দেশের পরিবহন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ ও হয়রানির শিকার। এই পেশাকে মর্যাদাসম্পন্ন করতে হলে রাষ্ট্রীয় নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।”

দেশে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর হয়রানি-নির্যাতনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, “গরিব, খেটে খাওয়া ও শ্রমজীবী শ্রেণিই দেশে সবচেয়ে বেশি কাঠামোগত নির্যাতনের শিকার হয়।” তিনি বলেন, “পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন শ্রমঘন পেশায় নিয়োজিত মানুষদের সামাজিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা না থাকায় তারা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের মুখে পড়ছে।” তার বক্তব্যে উঠে আসে, পেশাজীবী শ্রেণির মর্যাদা রক্ষায় শুধু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই নয়, প্রয়োজন নীতি ও আইনি কাঠামোর সমন্বিত সংস্কার।

বিদেশ অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত নাগরিকরা উবার বা ট্যাক্সি চালানোর মতো পেশায় যুক্ত থেকেও উন্নত মানের জীবনযাপন করেন, বাড়ি কেনেন এবং সামাজিক মূল্যেও তারা সমান মর্যাদা পান।” তিনি বলেন, “সেখানে একজন ট্যাক্সিচালক ও একজন ইঞ্জিনিয়ার বা চিকিৎসকের সামাজিক মূল্য সমান, শ্রেণিভেদহীন। সমাজ কাঠামোতে কাজের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য নেই।” রিজভীর বক্তব্যে এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তনের একটি তুলনামূলক প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে আসে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশেও এমন সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে ছোট কাজ-বড় কাজের বিভাজন থাকবে না, এবং প্রতিটি পেশা সমান সামাজিক মর্যাদা পাবে।” তার বক্তব্যে উঠে আসে, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, “বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি নিয়ে চাকরি না পেলেও যুবকরা প্রযুক্তিভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বা পরিবহন পেশায় যুক্ত হয়ে পরিবার ও নিজের দায়িত্ব নিতে পারে। বাংলাদেশেও সেই সুযোগ তৈরি করতে রাষ্ট্রকে নীতি ও আইন দিয়ে সহায়তা করতে হবে।”

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা কর্মসূচির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রিজভী বলেন, “শ্রমজীবী ও পেশাজীবী শ্রেণির মর্যাদা, বৈষম্যহীন সমাজ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বিএনপি নীতিগত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।” তিনি বলেন, “এই কর্মসূচি শুধু রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক কাঠামোতে বৈষম্য কমানো, অধিকারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং পেশাজীবীদের মর্যাদা নিশ্চিত করার একটি নীতিগত রূপরেখা।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সংগঠক সঞ্জয় দে রিপন এবং সঞ্চালনা করেন প্রধান সমন্বয়কারী আরিফুর রহমান তুষার। সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী শফু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, মোটরযান চালক দলের সদস্য সচিব এ কে এম ভিপি মুসা এবং এ কে এম ভিপি মুসাসহ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতারা। আলোচনায় পরিবহন খাতে কর্মরতদের পেশাগত অধিকার, সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা, এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নিশ্চিতের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও নীতি সংস্কারের তাগিদ উঠে আসে।

রিজভীর বক্তব্যের সারাংশে প্রতিফলিত হয়, পরিবহনসহ শ্রমঘন পেশায় যুক্ত মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন শ্রেণিভেদহীন সামাজিক মূল্যবোধ, কাঠামোগত সংগঠন, এবং আইনি-নীতি সংস্কারের সমন্বিত উদ্যোগ। তার বক্তব্যে পেশাজীবী শ্রেণির মর্যাদা ও অধিকারকে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রাষ্ট্রীয় নীতির মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত হয়।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ