জনসমর্থনের ভিত্তিতে স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন রুমিন ফারহানা

জনসমর্থনের ভিত্তিতে স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন রুমিন ফারহানা

রাজনীতি ডেস্ক

ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ৭ জানুয়ারি ২০২৬: ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, গত ১৭ বছর তিনি শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে নির্ভীক ভূমিকা পালন করেছেন এবং এ কারণেই জনগণের আস্থা ও সমর্থন অর্জন করেছেন। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের কুচনী গ্রামে এক নির্বাচনি পথসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

নির্বাচনি সভায় রুমিন ফারহানা বলেন, “বিগত ১৭ বছর দেশের অন্যতম শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়ে কথা বলেছি। ওই সময়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও জনগণ আমাকে মাঠে ও সংসদে সক্রিয় দেখেছে। কঠিন সময়ে মানুষের পাশে থাকার যে বার্তা তারা পেয়েছে, সেটিই তাদের আস্থার মূল ভিত্তি।” তিনি সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা আমাকে ছেড়ে যাবেন না, আমি আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।”

সভায় তিনি আরও বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে দীর্ঘ ২৫ বছর ধানের শীষ প্রতীকে কোনো প্রার্থী না থাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার দাবি প্রবল ছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী উকিল আবদুস সাত্তার ভূঞা বিজয়ী হলেও পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন, যা স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা দেয়। রুমিন ফারহানা বলেন, “২৫ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার যে দাবি ছিল, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিকল্প প্রতীক ও প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হয়েছে। একটি অস্থায়ী প্রতীক বা বিকল্প প্রার্থীর উপস্থিতি কখনোই জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নয়।”

প্রতীক বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “খেঁজুর গাছ প্রতীককে ধান হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। ধান বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর সমাজের জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রতীক। খেঁজুর গাছের সঙ্গে ধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থনৈতিক তাৎপর্য ও জনজীবনের সম্পর্ক ভিন্ন। প্রতীককে প্রতীকের জায়গায় মূল্যায়ন করতে হবে, কোনো প্রতীক অন্য প্রতীকের বিকল্প পরিচয় বহন করে না।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ভৌগোলিক কাঠামো অনুযায়ী, সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা এবং বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তি ও চান্দুরা ইউনিয়ন নিয়ে এ সংসদীয় আসন গঠিত। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি আসনটি তাদের রাজনৈতিক মিত্র জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দেয়। ফলে আসনটিতে দলীয় সমর্থন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। বিএনপি থেকে বহিষ্কারের পরও রুমিন ফারহানা একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন।

বিএনপির সাংগঠনিক নীতিমালা অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধারাবাহিকতায় দল তাকে বহিষ্কার করে। তবে বহিষ্কার-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি এখন দলীয় পরিচয়ের বাইরে থেকে নিজের প্রার্থী অবস্থান ও জনসমর্থনকে নির্বাচনি পুঁজি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের উত্থান সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অসন্তোষ, প্রতীক ও প্রার্থী-সংকট, এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে তৃণমূলের প্রত্যাশার ফারাক থেকে তৈরি হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ আসনটি বিগত একাধিক নির্বাচনে জোট, শরিক-ভিত্তিক সমঝোতা ও প্রার্থী পরিবর্তনের কারণে আলোচনায় ছিল। স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল— মূলধারার দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট ও সুসংহত থাকে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির কৌশলগত জোট সমঝোতা এবং রুমিন ফারহানার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত— দুটো মিলেই আসনটিতে প্রতীক, আনুগত্য ও জনসমর্থনের সমান্তরাল রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।

নির্বাচনি বক্তৃতায় তিনি নিজেকে ‘জনতার কণ্ঠ’ হিসেবে তুলে ধরলেও প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা হলো— তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে, যেখানে দলীয় সাংগঠনিক সমর্থন নেই; রয়েছে কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচিতি, সংসদীয় বক্তৃতা ও অতীত রাজনৈতিক ভূমিকার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা স্থানীয় সমর্থন। বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা কখনো কখনো দলীয় কাঠামোর সমান্তরাল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা স্থানীয় ভোটারদের স্বাক্ষর-সমর্থন, প্রচারণা, প্রতীক বরাদ্দ এবং নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। সে অনুযায়ী রুমিন ফারহানা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আসনটিতে এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে— জোট-সমর্থিত শরিক প্রার্থী ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা-নির্ভর স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে, যেখানে ভোটাররা প্রার্থী, প্রতীক ও অতীত ভূমিকার সমন্বয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবেন।

প্রতিবেদনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের বর্তমান নির্বাচনি সমীকরণ, প্রার্থী পরিচয়, প্রতীক বিতর্ক, এবং তৃণমূল রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রস্তুত করা হয়েছে।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ