অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
সরকার ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করবে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিজেল আমদানিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর একটি অংশ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট অর্থ ব্যাংকঋণ থেকে জোগান দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে ডিজেল আমদানি সম্পন্ন করা হবে। এটি ২০২৬ সালের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির নীতিগত অনুমোদনের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে গত ২২ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি ২০২৬ সালের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এবার এনআরএল থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে অনুমোদন পেল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দর–কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারিত এ আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ১১ কোটি ৯১ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪৬১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আমদানি ব্যয় ডলারভিত্তিক হলেও বিনিময় হারের তারতম্যের কারণে টাকার অঙ্ক কিছুটা পরিবর্তনশীল থাকতে পারে।
আমদানিকৃত ডিজেলের প্রতি ব্যারেলের প্রিমিয়াম ধরা হয়েছে ৫.৫০ ডলার এবং ভিত্তিমূল্য ৮৩.২২ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভিত্তিমূল্য পরিবর্তনশীল থাকবে বলে ক্রয় প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণত পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রিমিয়াম বলতে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত প্ল্যাটস বা এমওপিএজি (MOPAG/MOPAS) দরসহ অতিরিক্ত মূল্যকে বোঝায়, যা পরিবহন–লজিস্টিকস, সরবরাহ নিশ্চয়তা ও চুক্তিভিত্তিক শর্ত অনুসারে নির্ধারিত হয়। এই প্রিমিয়াম তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা হলেও ভিত্তিমূল্য বৈশ্বিক বাজারদরের ওঠানামা অনুসারে সমন্বয় করা হয়।
বৈঠক শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, এনআরএলের সঙ্গে ডিজেল আমদানি ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এই চুক্তি পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে সম্পাদিত হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার ওই চুক্তির ধারাবাহিকতায় আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রধান সুবিধা হলো সরবরাহ নিশ্চয়তা, প্রিমিয়ামের স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশী উৎস থেকে পাইপলাইনভিত্তিক পরিবহনের কারণে তুলনামূলক কম লজিস্টিকস ব্যয়। আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন বর্তমানে এই চুক্তির অন্যতম কাঠামোগত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে গত বছরের জানুয়ারিতেও এনআরএল থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রতি ব্যারেলের প্রিমিয়াম ৫.৫০ ডলারই ছিল। অর্থাৎ, প্রিমিয়াম অপরিবর্তিত রেখে এবার আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এটি অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের চাহিদা বৃদ্ধি, পরিবহন–কৃষি–শিল্পখাতে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত মজুত ব্যবস্থাপনার অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনআরএলের পরিশোধনাগার ভারতের আসাম রাজ্যে অবস্থিত। সেখান থেকে পরিশোধিত ডিজেল পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বিপিসির ডিপোতে পৌঁছে। আগে রেল বা ট্যাংক–লরির মাধ্যমে পরিবহন করা হলেও ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ–ভারত মৈত্রী পাইপলাইন নির্মাণের পর ডিজেল পরিবহন এখন মূলত পাইপলাইনভিত্তিক ব্যবস্থায় সম্পন্ন হচ্ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পাইপলাইনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ২০২৩ সাল থেকে পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরু হয়ে ২০২৪ সালে বাণিজ্যিক পরিবহন পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হয়। পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহনের ফলে পরিবহন ব্যয় কমে, অপচয় ও চুরি–ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং সরবরাহ সময়ও সাশ্রয়ী হয়।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে রাজধানী ঢাকায় এনআরএলের একটি লিয়াজোঁ অফিস কার্যক্রম শুরু করেছে। এই অফিসের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি–লজিস্টিকস সমন্বয়, শুল্ক–বন্দর প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও কারিগরি যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এনআরএলের মোট টার্নওভার ছিল ২৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক পরিশোধন ও জ্বালানি সরবরাহ সক্ষমতার একটি নির্দেশক।
তবে এনআরএলের বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণের অভিযোগও রয়েছে। ধনশিরি নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার অভিযোগে ভারতের ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) চলতি বছরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা গ্রহণ করেছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। যদিও এটি সরাসরি বাংলাদেশের আমদানি চুক্তির অংশ নয়, তবু সীমান্ত–সংলগ্ন জ্বালানি সহযোগিতা ও পাইপলাইন লজিস্টিকস ব্যবস্থায় পরিবেশগত মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক প্রভাব পর্যবেক্ষণ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি কাঠামো বহুলাংশে আমদানি–নির্ভর। ডিজেল দেশের পরিবহন খাত, কৃষি সেচ, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণ–যন্ত্রপাতি ও শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খলে অন্যতম ব্যবহৃত জ্বালানি। দেশে দৈনিক ডিজেলের গড় চাহিদা ১৪–১৫ হাজার টনের কাছাকাছি, মৌসুমভেদে যা ১৬ হাজার টনেও পৌঁছে। ফলে বার্ষিক ১.৮০ লাখ টন আমদানি চুক্তি অভ্যন্তরীণ সরবরাহ–চাহিদা ভারসাম্য ও কৌশলগত মজুত পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি ক্রয় কমিটির এই অনুমোদন ডিজেল সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখা, প্রতিবেশী উৎস থেকে জ্বালানি পরিবহন ব্যয়–সাশ্রয়ী কাঠামো বজায় রাখা এবং বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য–পরিবর্তন, বিনিময় হার, লজিস্টিকস ব্যয় ও পরিবেশগত ঝুঁকি—এসব বিষয় সমন্বয় করেই চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


