জাতীয় ডেস্ক
ঢাকা, ৭ জানুয়ারি ২০২৬ — আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আচরণবিধি প্রতিপালন, নির্বাচনি অনিয়ম প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে তিন স্তরের বিশেষ তদারকি কাঠামো গঠনের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসি সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক এক পরিপত্রে এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই এই নির্দেশনার প্রধান উদ্দেশ্য। রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে এই কাঠামো বাস্তবায়নে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অবৈধ প্রভাব বিস্তার, অতিরিক্ত ব্যয়, উসকানিমূলক বক্তব্য, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার এবং যে কোনো ধরনের অশুভ তৎপরতা প্রতিরোধে ইসি একটি বহুমাত্রিক মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নির্দেশনার আওতায় গঠিত টিম ও সেলগুলো আইন, বিধিমালা ও প্রচলিত প্রশাসনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে।
ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিমের কাঠামো ও দায়িত্ব
পরিপত্রের আলোকে জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা পর্যায়ে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে ‘ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম’ গঠন করা হবে। এই টিমে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, নির্দলীয় বিশিষ্ট নাগরিক ও বেসরকারি পর্যায়ের নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।
টিমের প্রধান কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে— গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা ২০২৫–এর প্রতিপালন সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ; প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে কি না তা তদারকি; আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা চিহ্নিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাচনি তদন্ত কমিটিকে অবহিত করা; বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ; এবং নির্বাচনি এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন কমিশনে প্রতিবেদন প্রেরণ।
এছাড়া, প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনি এজেন্ট ও প্রচারে যুক্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আচরণবিধি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি, বিশেষ করে গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের বিধানটি স্পষ্টভাবে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন মনিটরিং টিমের গঠন
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘নির্বাচন মনিটরিং টিম’ গঠন করার নির্দেশ দিয়েছে ইসি। এই টিম নির্বাচনি প্রচার, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, প্রচার-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা, ভোটারদের অংশগ্রহণ পরিস্থিতি এবং প্রচারে সমতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করবে।
নির্বাচন মনিটরিং টিম মূলত প্রতিযোগী প্রার্থীদের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে প্রশাসন ও কমিশনের কাছে সুপারিশ ও অভিযোগ দ্রুত পৌঁছাতে একটি সমন্বয়ক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। এতে অন্তর্ভুক্ত প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার বাস্তবতা তুলে ধরে কমিশনের তদারকি কার্যক্রমকে সহায়তা প্রদান করবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেলের গঠন ও কার্যপরিধি
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখতে রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল’ গঠন করতে বলা হয়েছে। এই সেলে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন অফিসার, পুলিশ সুপার বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের প্রতিনিধি, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মনোনীত কর্মকর্তা এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে থাকবেন।
এই সেলের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ; অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা ও তদারকি; সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাস্তান হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি অভিযান সমন্বয়; গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা; গোলযোগপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন; এবং নির্বাচনি এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসি সচিবালয়কে নিয়মিত অবহিত করা।
অন্যান্য প্রশাসনিক ও সমন্বয় নির্দেশনা
ভোটারদের অবাধ ও নির্ভয় ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে সহযোগিতা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারী ভোটারসহ সব শ্রেণি-পেশার নাগরিককে নিরাপদে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে, আচরণবিধি লঙ্ঘন, উসকানিমূলক বক্তব্য, আর্থিক প্রলোভন বা পেশিশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত করার যে কোনো চেষ্টা প্রতিরোধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ রয়েছে। নির্বাচনি কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার বা মহানগর এলাকার ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে।
পরিপত্রে আরও বলা হয়, ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং ও নিরাপত্তা টিম মোতায়েন করে ভোটারদের কেন্দ্রে আসা ও বাড়ি ফেরার পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তুতকৃত কর্মপরিকল্পনা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসির এই নির্দেশনাকে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার মাঠ-প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে নির্বাচনি আচরণ, ব্যয়, প্রচারের সমতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একীভূত নজরদারির আওতায় আসবে।


