আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, দেশটির তেল কোম্পানিগুলো আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম শুরু করতে পারে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে এবং এই বিনিয়োগ প্রাথমিকভাবে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো করবে। তিনি জানান, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ওই অর্থ কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করবে অথবা রাজস্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হবে। ট্রাম্পের ভাষ্য, “এতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা তেল কোম্পানিগুলোই প্রাথমিকভাবে বহন করবে।”
মাদুরোকে অপসারণের পর ট্রাম্প পূর্বে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে। ওই বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় এবার তিনি দেশটিতে মার্কিন তেল কোম্পানির কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাব্য সময়সীমা উল্লেখ করলেন। তিনি আরও বলেন, ১৮ মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও তার ধারণা, এই সময় শেষ হওয়ার আগেই দেশটির তেল উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে পারে। তবে এর জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ ও কারিগরি পুনর্গঠন অপরিহার্য বলে জানান তিনি।
ভেনেজুয়েলায় তেল কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পেট্রোলিয়াম কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈঠকের পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে। বৈঠকে তেল অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ কাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত দিকগুলো আলোচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি একাধিক বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোলিয়াম খাতের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিনিয়োগ সক্ষমতা ভেনেজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো সংস্কারে কার্যকর অবদান রাখতে পারে।
বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল রিজার্ভ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটিতে আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুত আছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা আগের অবস্থানে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি সীমিত পরিসরে সেখানে কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলার মতো তেলসমৃদ্ধ দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং বৈশ্বিক বাজারে তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।” তার বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, তেলের মূল্য স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাত, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং ভোক্তা পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, মাদুরোর বিরুদ্ধে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে একাধিক ফৌজদারি অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাদক পাচার, অর্থপাচার এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। তার অপসারণের ফলে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে এবং দেশটির জ্বালানি খাত পরিচালনায় সম্ভাব্য বহুপাক্ষিক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনকে ২০০০–এর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে এবং এতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে, তেল উত্তোলন, শোধনাগার সংস্কার, পাইপলাইন পুনর্গঠন, রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে, স্থানীয় শ্রমবাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমন্বয়ও এই খাত পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন তেল কোম্পানির সম্ভাব্য প্রবেশ দেশটির জ্বালানি খাত ও বৈশ্বিক বাজারে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে কার্যক্রম বাস্তবায়নে সময়, বিনিয়োগ কাঠামো, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা–সংক্রান্ত নীতি, স্থানীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে লাতিন আমেরিকার জ্বালানি রাজনীতি, আঞ্চলিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক নীতিবিশ্লেষকরা মনে করছেন।


