মনোনয়ন আপিলের দ্বিতীয় দিনে ইসিতে ১২২ আবেদন, দুই দিনে মোট ১৬৪

মনোনয়ন আপিলের দ্বিতীয় দিনে ইসিতে ১২২ আবেদন, দুই দিনে মোট ১৬৪

জাতীয় ডেস্ক

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি ২০২৬: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিল নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণের দ্বিতীয় দিনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ১২২ প্রার্থীর আবেদন জমা পড়েছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ইসির আপিল আবেদন গ্রহণ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় বুথ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। দুই দিনে কমিশনে মোট আপিল আবেদন জমা পড়েছে ১৬৪টি।

ইসি সূত্রে জানা যায়, সোমবার (৫ জানুয়ারি) আপিল গ্রহণের প্রথম দিনে ৪২ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে একটি আবেদন বৈধ প্রার্থীর মনোনয়নের বিরুদ্ধে এবং বাকি ৪১টি আবেদন বাতিল প্রার্থিতা পুনর্বহালের জন্য দাখিল করা হয়। মঙ্গলবার জমা পড়া ১২২টি আপিলের সবগুলোই বাতিল প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার দাবিতে করা হয়েছে।

নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেন। বাছাই শেষে যেসব মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণ করা হয়েছে, সেসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত আপিল আবেদন গ্রহণ করছে নির্বাচন কমিশন। আপিল নিষ্পত্তির জন্য ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি ২০২৬। ২১ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তারা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ দেবেন। প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে, যা ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলবে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

মনোনয়ন আপিলের এই ধাপ বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে প্রার্থীদের সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত প্রাথমিক হলেও তা চূড়ান্ত নয়; নির্বাচন কমিশন আপিল শুনানির মাধ্যমে আইনানুগ ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, বহাল বা বাতিল করতে পারে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, আপিল শুনানিতে প্রার্থীদের ঋণখেলাপ, কর বকেয়া, হলফনামায় তথ্য গোপন, দ্বৈত নাগরিকত্ব, স্বাক্ষর–সংক্রান্ত ত্রুটি, প্রস্তাবক–সমর্থকের বৈধতা, বয়স, পেশা, সম্পদ বিবরণী ও ফৌজদারি মামলার তথ্য যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলো পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া, প্রার্থীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, তথ্যের সঠিকতা এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার আলোকে ন্যায্য শুনানি নিশ্চিত করা হবে।

দ্বিতীয় দিনে ১২২টি আপিল জমা পড়া থেকে বোঝা যায়, মনোনয়ন যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অসন্তুষ্ট। অতীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোতেও আপিল আবেদন সংখ্যা বেশি দেখা গেছে, বিশেষ করে যখন প্রার্থিতা বাতিলের হার তুলনামূলকভাবে উচ্চ হয়। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনের আপিল পরিসংখ্যানেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে প্রার্থীরা সাধারণত প্রমাণ উপস্থাপনে প্রশাসনিক ত্রুটি, নথির অসম্পূর্ণতা, আর্থিক তথ্য হালনাগাদে বিলম্ব, ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নগত অসামঞ্জস্য এবং প্রযুক্তিগত ভুলের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, আপিল শুনানির পর বাতিল প্রার্থিতার একটি অংশ পুনর্বহাল হতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে প্রার্থীদের উপস্থাপিত নথি, তথ্যের আইনগত ভিত্তি এবং অভিযোগ–সংক্রান্ত প্রমাণের মানের ওপর। নির্বাচন কমিশনের আপিল নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া শুধু প্রার্থিতা পুনর্বিবেচনার সুযোগই নয়, বরং নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসি সূত্রে আরও জানা যায়, আপিল আবেদন গ্রহণের জন্য কমিশনে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে আইন শাখা, যাচাই কমিটি এবং শুনানি প্যানেল সমন্বিতভাবে কাজ করছে। প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত দিনে সশরীরে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। শুনানি শেষে কমিশনের সিদ্ধান্ত লিখিত আকারে জানিয়ে দেওয়া হবে এবং তা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হবে, যাতে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত ও প্রতীক বরাদ্দ কার্যক্রমে তা প্রতিফলিত হয়।

মনোনয়নপত্র যাচাই ও আপিল ধাপ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার একটি আইনি ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, যার মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ন্যূনতম যোগ্যতা ও আইনানুগ মান নিশ্চিত করা হয়। একইসঙ্গে, আপিল শুনানি প্রার্থীদের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকার–ব্যবস্থা, যা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতার অংশ হিসেবে বিবেচিত।

এদিকে, আপিল গ্রহণের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আবেদন সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে কমিশন ধারণা করছে। ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ চলবে এবং ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে শুনানি। কমিশন জানিয়েছে, প্রতিটি আপিল নিষ্পত্তিতে ন্যায্য শুনানি, আইনি বিশ্লেষণ এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় মনোনয়ন যাচাই–বাছাই এবং আপিল নিষ্পত্তি ধাপ প্রার্থীদের অংশগ্রহণের বৈধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্র বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আপিল নিষ্পত্তির পরই স্পষ্ট হবে, কতজন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে ফিরতে পারছেন এবং নির্বাচনি সমীকরণে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ