আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান তার শত্রুদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ‘আগাম প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ পরিচালনার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। নবগঠিত ‘ইরানিয়ান ডিফেন্স কাউন্সিল’ গত মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা প্রদান করে। বিবৃতিটি প্রকাশের সময় উল্লেখ করা হয়, যদি কোনো পক্ষ ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে শুধু পাল্টা জবাবেই সীমাবদ্ধ না থেকে সম্ভাব্য হুমকির লক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে ‘আগাম সামরিক পদক্ষেপ’ গ্রহণ করা হতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা কাউন্সিলের কাছে ‘রেডলাইন’ হিসেবে বিবেচিত, যা কোনো পরিস্থিতিতেই লঙ্ঘনযোগ্য নয়। একই সঙ্গে আগ্রাসন বা শত্রুতামূলক আচরণের ক্ষেত্রে ‘সমপর্যায়ের কৌশলে কঠোর প্রতিক্রিয়া’ প্রদানের ঘোষণাও দেওয়া হয়। বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ বক্তব্যকে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
কাউন্সিল গঠনের প্রেক্ষাপট হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ইরান–ইসরায়েল সামরিক সংঘাতকে উল্লেখ করা হয়। ওই সংঘাতের পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ‘ইরানিয়ান ডিফেন্স কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য প্রতিরক্ষা নীতি সমন্বয়, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বিবৃতিতে কাউন্সিল আরও জানায়, ‘দৃশ্যমান হুমকির আভাস’ পেলেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং যেকোনো আক্রমণের জবাব ‘একই কৌশলে’ দেওয়া হবে।
এই হুঁশিয়ারি প্রকাশের ঠিক দুই দিন আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের সক্ষমতা যাচাই করতে বৃহৎ পরিসরের সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। সামরিক মহড়ার লক্ষ্য ছিল প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, রাডার সিস্টেমের কার্যকারিতা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মোতায়েন কৌশল এবং সমন্বিত কমান্ড কাঠামোর দক্ষতা মূল্যায়ন। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, মহড়ায় বিমান বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ইউনিট, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনাকারী দল এবং ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বিত কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। মহড়া শেষে প্রকাশিত সামরিক মূল্যায়নে দাবি করা হয়, ইরানের প্রতিরক্ষা ইউনিট ‘সমন্বিত ও বহুস্তরীয় হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম’।
বিবৃতিটি জারি করার সময় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইতোমধ্যে উচ্চমাত্রার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। গাজা–ইসরায়েল সংঘাত, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে নৌ–নিরাপত্তা ঝুঁকি, আঞ্চলিক জোটগুলোর সামরিক সক্রিয়তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব কারণে অঞ্চলটি ২০২৫ সালজুড়ে বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। বিশেষত হরমুজ প্রণালী, যা বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, সেই প্রণালীতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি ও নৌ–নিরাপত্তা ঝুঁকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় উদ্বেগ তৈরি করে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট দেশটির নিরাপত্তা হিসাব–নিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরানে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মুদ্রাস্ফীতি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ইরানিয়ান রিয়ালের মানে ঐতিহাসিক পতন লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, রপ্তানি আয়ে সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য–অস্থিরতা—এসব মিলিয়ে ইরানের অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রায় পড়ে।
অর্থনৈতিক চাপের ধারাবাহিকতায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সংকট, মুদ্রার মান পতন এবং মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যাপক মোতায়েন দেখা যায়। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার এই সময়ে প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের ‘আগাম হামলা’ ঘোষণাকে দেশটির নিরাপত্তা–কেন্দ্রিক কৌশলগত নীতির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে—যেখানে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও বাহ্যিক নিরাপত্তা সমান্তরালভাবে সংযুক্ত।


