ঋণখেলাপীদের প্রার্থী মনোনয়নে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা

ঋণখেলাপীদের প্রার্থী মনোনয়নে রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা

রাজনীতি ডেস্ক

কুমিল্লা, ৮ জানুয়ারি ২০২৬ — জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেছেন যে ব্যালটের মাধ্যমে ঋণখেলাপীদের নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) কুমিল্লার দেবিদ্বারে জয়পুর চাঁন মিয়া মার্কেটের সামনে ওসমান হাদির স্মরণে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি এ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্থানীয় নেতাকর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ নাগরিকদের সামনে তিনি বলেন, ঋণখেলাপীরা সংসদে গিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এমন নীতি প্রণয়ন করতে পারে যাতে জনগণের অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য না হতে হয়। ফলে নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বক্তব্যের শুরুতে সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপীদের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের নতুন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক ও আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিদের নির্বাচনী টিকিট দেওয়া হচ্ছে। যারা ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেয় না, তারা সংসদে গিয়ে কী বার্তা দিতে চায়, সেটি রাজনৈতিক নীতির প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি ব্যক্তিগত ঋণ শোধে ব্যর্থ, তার পক্ষে জনসেবা কার্যক্রমে কতটা সক্ষমতা থাকবে— সেটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বক্তব্যে তিনি আর্থিক খাতে ঋণখেলাপের প্রভাব তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে, যা মোট ঋণের প্রায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগ সক্ষমতা, ব্যাংকের তারল্য, নতুন উদ্যোক্তা ঋণ ও আমানতকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে খেলাপি ঋণ ইস্যু নির্বাচনী আলোচনায় বারবার উঠে আসার পেছনে এটিও একটি কারণ। নাগরিক সমাজের একাংশের মতে, নির্বাচনে ঋণখেলাপী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও সীমান্ত-সংক্রান্ত ঘটনার প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা দৃশ্যমান থাকলেও একটি হত্যাকাণ্ডের আগাম তথ্য থাকার পরও অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি— এমন অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, গোয়েন্দা সক্ষমতার মূল লক্ষ্য অপরাধ প্রতিরোধ, সীমান্ত নজরদারি, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও সময়োচিত হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা। যেকোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সন্দেহভাজনদের গতিবিধি, সীমান্ত সংযোগ, আর্থিক লেনদেন ও প্রযুক্তিগত ফরেনসিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ট্রেইল, আর্থিক নথি ও আন্তঃদেশীয় তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বক্তব্যের শেষাংশে হাসনাত আবদুল্লাহ নিহত ওসমান হাদি প্রসঙ্গে বলেন, তার হত্যার বিচার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপ ও জন-দাবি তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ৭ জানুয়ারির অনুষ্ঠানে স্থানীয় নেতাকর্মীরা হাদি হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এনসিপির স্থানীয় সূত্র জানায়, দলটি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিতে আইনি ও রাজনৈতিক পর্যায়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণের কারণে আর্থিক খাতে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি রাজনৈতিক অঙ্গনে নীতিগত আলোচনায় প্রতিফলিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা, আর্থিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন এবং নিরাপত্তা তদন্ত সক্ষমতা— সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে এসব ইস্যু ক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি পদক্ষেপ, ক্রেডিট শৃঙ্খলা জোরদার, আমানত সুরক্ষা, আন্তঃদেশীয় তথ্য বিনিময়, নির্বাচন কমিশনের নীতিগত নজরদারি এবং রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এনসিপির এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আর্থিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও নিরাপত্তা তদন্ত সক্ষমতা— তিনটি ক্ষেত্রই আগামী নির্বাচনগুলোতে নীতিগত আলোচনায় আরও প্রাধান্য পেতে পারে। নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে ঋণখেলাপী প্রার্থীদের বিষয়ে নাগরিক মতামতের প্রতিফলন রাজনৈতিক কৌশল ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ