চাঞ্চল্যকর কুতুবদিয়া ছাত্রলীগ নেতা রুবেল হত্যা মামলায় ৪ জনের ফাঁসি, ৪ জন খালাস

চাঞ্চল্যকর কুতুবদিয়া ছাত্রলীগ নেতা রুবেল হত্যা মামলায় ৪ জনের ফাঁসি, ৪ জন খালাস

আইন আদালত ডেস্ক

চট্টগ্রামের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালত কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা এরশাদুল হাবীব রুবেল হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। একই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আরও চার আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (৮ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. হেমায়েত উদ্দিন এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—জাহেদুল ইসলাম ওরফে ফরহাদ, আবু এরশাদ ওরফে জুয়েল, রুস্তম আলী এবং আবদুল্ল্যা আল মামুন। রায়ে বলা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার আদেশ কার্যকর করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাহেদুল ইসলাম ফরহাদ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় শেষে সাজা পরোয়ানামূলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি তিন আসামি পলাতক থাকায় আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি আদেশ জারি করেছেন।

অপরদিকে খালাসপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন—আজহারুল ইসলাম, তৌহিদুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ এবং মোহাম্মদ সৈয়দ। আদালত সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার পর খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের মুক্তির নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে।

মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারিক কার্যক্রম
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আশরাফ হোসেন চৌধুরী রাজ্জাক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ২০০৬ সালের ১৭ অক্টোবর কুতুবদিয়া থানায় ১৮ জনকে আসামি করে এ হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে বাদী ছিলেন নিহত রুবেলের মা। ২০০৮ সালে তদন্ত শেষে পুলিশ আট জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরবর্তীতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

বিচার চলাকালে মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার সময় মামলার বাদী ও আসামিপক্ষ পরস্পর প্রতিবেশী ও আত্মীয়সম্পর্কে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জায়গাজমি দখল ও মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জের এবং পারস্পরিক আক্রোশ থেকে একে অপরকে ঘায়েল করতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, পাল্টা মামলা এবং সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

রায়ে প্রসিকিউশন পক্ষের বরাতে আদালত বলেন, বিরোধের কারণে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে চরমে ছিল এবং এর মধ্যেই ২০০৬ সালের ১৫ অক্টোবর পরিকল্পিত হামলায় নিহত হন ছাত্রলীগ নেতা রুবেল।

নিহত রুবেলের পরিচয়
এরশাদুল হাবীব রুবেল ২০০৬ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তিনি চট্টগ্রামের ওমর গণি এমইএস কলেজ ছাত্রসংসদের সদস্য ছিলেন এবং একইসঙ্গে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় থাকলেও মামলার নথি অনুযায়ী তাঁর হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ছিল পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ, যা পরবর্তীতে সহিংস সংঘাতে রূপ নেয়।

বিচার শুরুর দীর্ঘসূত্রতা ও স্থানান্তর
মামলাটি ২০১০ সালে কক্সবাজার জেলা আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তী ১২ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ না হওয়ায় মামলার কার্যক্রম স্থবির ছিল। ফলে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। পরে ২০২২ সালে মামলার নথি স্থানান্তরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০২৩ সালে চট্টগ্রামের আদালতে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে নিয়মিত শুনানি, সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করে আদালত চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।

বাদীপক্ষের পরিবর্তন
মামলার মূল বাদী নিহতের মা মৃত্যুবরণ করার পর বাদীর স্থলাভিষিক্ত হন নিহত রুবেলের ছোট ভাই ব্যারিস্টার মো. হানিফ বিন কাশেম। মামলার কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে তাঁর ভূমিকা আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, নথি স্থানান্তরের পর মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ, শুনানি ও যুক্তিতর্ক দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়েছে, যা দীর্ঘ বিচারিক স্থবিরতার অবসান ঘটায়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়ের তাৎপর্য
হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় সর্বোচ্চ শাস্তি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সাক্ষ্য–প্রমাণ, ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণ এবং প্রসিকিউশন পক্ষের উপস্থাপিত নথিতে হত্যার পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। অপরদিকে খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সাক্ষ্য–প্রমাণে সমর্থিত না হওয়ায় তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জানান, পলাতক তিন আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আদালতের আদেশ ইতোমধ্যে প্রেরণ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার সম্পন্ন হলে তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ড কার্যকরের পরবর্তী আইনি ধাপ শুরু হবে।

বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় হত্যা মামলার দীর্ঘসূত্রতা একটি আলোচিত বাস্তবতা। এ মামলাটি নথি স্থানান্তরের পর দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় আদালতের কার্যক্রমে প্রশাসনিক ও বিচারিক সমন্বয়ের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একইসঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে আদালতের রায় আইনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, সাক্ষ্য–প্রমাণের গুরুত্ব এবং বিচারিক মূল্যায়নের ভিত্তিকে আরও স্পষ্ট করেছে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ