রাজনীতি ডেস্ক
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনের ৩৮টি সাধারণ কেন্দ্র ও একমাত্র নারী হলের ভোটগণনা সম্পন্ন হয়েছে। ২১টি পদের মধ্যে ১৬টিতে জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। বুধবার (৮ জানুয়ারি) মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান।
নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ৮ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৩৮টি একাডেমিক ভবন ও বিভাগভিত্তিক কেন্দ্রে এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। মোট ভোটার ছিল ১৮ হাজার ৯৪২ জন। এর মধ্যে সাধারণ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১৪ হাজার ৮৭৬টি এবং নারী হলে ২ হাজার ৪৯০টি। বাকি ভোট বিভিন্ন কারণে বাতিল বা অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য হয়। মোট ভোটের হার দাঁড়ায় ৯১.৬ শতাংশ।
ফলাফল অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) পদে বিজয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্রার্থী মো. রিয়াজুল ইসলাম। তিনি ৫ হাজার ৫৯৮ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত ও ছাত্রঅধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি একেএম রাকিব ৪ হাজার ৬৮৮ ভোট পান। ভিপি পদে রিয়াজুল ৯১০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস) পদে বিজয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্রার্থী আব্দুল আলিম আরিফ। তিনি পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৭৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত খাদিজাতুল কুবরা পেয়েছেন ২ হাজার ২০৩ ভোট। জিএস পদে ভোটের ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ২৭২। অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি (এজিএস) পদে শিবির প্যানেলের মাসুদ রানা ৫ হাজার ২০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। এ পদে ছাত্রদল সমর্থিত তানজিল ৩ হাজার ৯৪৪ ভোট পান। এজিএস পদে মাসুদ ১ হাজার ৭৬ ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন।
অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেল থেকে অন্যান্য সম্পাদকীয় পদেও জয় পেয়েছেন শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক পদে মো. নুরনবী ৫ হাজার ৪০০ ভোট, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে ইব্রাহীম খলিল ৫ হাজার ৫২৪ ভোট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে সুখীমন খাতুন ৪ হাজার ৪৮৬ ভোট, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে নুর মোহাম্মদ ৪ হাজার ৪৭০ ভোট, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে হাবীব মোহাম্মদ ফারুক ৪ হাজার ৬৫৪ ভোট, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে নওশীন নাওয়ার ৪ হাজার ৪০১ ভোট, ক্রীড়া সম্পাদক পদে জর্জিস আনোয়ার নাইম ২ হাজার ৪৬৭ ভোট এবং সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে মোস্তাফিজুর রহমান ৩ হাজার ৪৮৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র নারী হলে মোট ১৩টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভিপি, জিএস, এজিএসসহ ১০টি পদে জয় পেয়েছেন শিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেলের প্রার্থীরা। নারী হলে ভিপি পদে বিজয়ী হয়েছেন জান্নাতুল উম্মি তারিন, যিনি অনানুষ্ঠানিক ফলের ভিত্তিতে জয় নিশ্চিত করেন। এ কেন্দ্রে জিএস পদে সুমাইয়া তাবাসসুম এবং এজিএস পদে রেদওয়ানা খাওলা বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়া সাংস্কৃতিক সম্পাদক, সাহিত্য সম্পাদক, সমাজসেবা সম্পাদক, ধর্ম সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক, পাঠাগার সম্পাদক ও হল ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক পদেও একই প্যানেলের প্রার্থীরা জয় পান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ৮ জানুয়ারি রাত ১২টা ৩০ মিনিটে ৩৮টি কেন্দ্র ও নারী হলের ভোটগণনা সম্পন্ন হয়। নির্বাচন কমিশনের অধীনে ১২০ জন সহকারী কমিশনার, ৩৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার এবং ৭৬ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ৩৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী ও ২২০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নির্বাচনী পরিবেশ নিরাপদ ও সুষ্ঠু রাখতে কাজ করেন।
জকসু নির্বাচন ১৯৯০ সালের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এর আগে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি জকসু নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয় এবং ১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা গ্রহণ করা হয়। ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনী ফল প্রকাশের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন শান্তিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানায়। ছাত্রদল, ছাত্রঅধিকার পরিষদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আনুষ্ঠানিক কোনো আপত্তি জমা পড়েনি বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান। তিনি জানান, ‘নির্বাচন সংক্রান্ত আপত্তি বা পুনঃগণনার আবেদন গ্রহণের জন্য ৯ জানুয়ারি দুপুর ২টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কোনো আবেদন জমা না পড়লে এই ফল চূড়ান্ত হিসেবে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপকরা মনে করছেন, জকসুর এই নির্বাচনী ফল ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। ১৯৯০–পরবর্তী সময়ে জাতীয় ছাত্র রাজনীতির যে ধারাবাহিক বিভাজন ও প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই প্রতিফলন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখা গেল। ক্যাম্পাসে শিবির সমর্থিত প্যানেলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জয় শিক্ষার্থী রাজনীতিতে নীতি–নির্ধারণ, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ক্লাব–সমিতির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও ক্যাম্পাসের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্বে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, বিজয়ী প্যানেলের শপথগ্রহণ ১২ জানুয়ারি ২০২৬ বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে এবং ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জকসুর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।


