রাজনীতি ডেস্ক
ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যার ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক সহিংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ কোনো সংযোগ নেই এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড, নির্বাচনী পরিবেশ, তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে দলীয় অবস্থান তুলে ধরা হয়।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর তেজতুরী বাজার–তেজকুনিপাড়া সংলগ্ন এলাকায় অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা মোটরসাইকেলে এসে মুসাব্বিরসহ দুজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি অতর্কিতে গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে প্রথমে বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহত অপর ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তেজতুরী বাজার প্রশাসনিকভাবে তেজগাঁও থানার অন্তর্ভুক্ত তেজকুনিপাড়া–তেজতুরী বাজার অঞ্চলের অংশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, হত্যার উদ্দেশ্য, ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন, গুলির সংখ্যা, হামলাকারীদের পালানোর রুট ও পরিচয় শনাক্তে প্রযুক্তিগত ও মাঠ পর্যায়ের তদন্ত চলছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও ডিজিটাল ট্রেইল বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের গতিবিধি যাচাই, সাক্ষ্য গ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্তে কাজ করছে তদন্ত দল। পুলিশ আরও জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোটিভ বা দায় নির্ধারণ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, “এটি একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক সহিংসতা, যার সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোনো সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এ ধরনের ঘটনা ভোটার উপস্থিতি, নির্বাচনী অংশগ্রহণ বা ফলাফলে প্রভাব ফেলবে—এমন কোনো তথ্য নেই।” তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
নির্বাচনী পরিবেশে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগ বিষয়ে সালাউদ্দিন আহমদ জানান, যে কোনো দল নির্বাচনকালীন পরিবেশ নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে দাখিল করতে পারে। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে তদন্ত, নিষ্পত্তি ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম। বিএনপি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে এবং আচরণবিধি অনুসরণে দলীয় পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং শহিদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য। শহিদদের কবর জিয়ারত ও পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার মতো কর্মসূচি সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশন চাইলে যে কোনো কর্মসূচি মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা দিতে পারে; তবে শোক, সামাজিক বা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কর্মসূচিকে প্রচারণা হিসেবে গণ্য করা হবে কি না—সে বিষয়ে কমিশনের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া নেতাদের বিষয়ে তিনি বলেন, বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক যোগ্য নেতাকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসঙ্গে তিনি জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে একাধিক নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ, সাময়িক বহিষ্কার ও প্রাথমিক তদন্ত। পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আলোচনা ও সমঝোতার পথ খোলা রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হত্যার ঘটনা দেশের নিরাপত্তা কাঠামো, প্রশাসনিক তৎপরতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন মূল্যায়ন বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রচলিত। নির্বাচনকালীন স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা, দ্রুত তদন্ত, নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব ঘটনার ফলে প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা জোরদার, প্রচারণা সমাবেশে শৃঙ্খলা রক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ম্যাপিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা আরও সংহত করার তাগিদ তৈরি হয়।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যাতে সহিংসতা বা সংঘাতের পথে না যায়, সে বিষয়ে আইনগত ও প্রশাসনিক কাঠামো কঠোর নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি ও নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তৎপরতা নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্যতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। মুসাব্বির হত্যার ঘটনাও সেই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন ও তদন্ত প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।


