ফার্মগেটে গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির নিহত, তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

ফার্মগেটে গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির নিহত, তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

রাজধানী ডেস্ক

ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুসাব্বির দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। বুধবার (০৭ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার স্টার হোটেলের সামনের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে অন্তত ৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় ঘটনাস্থলে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন; তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ফার্মগেটের ব্যস্ত বাণিজ্যিক অঞ্চলে স্টার হোটেলের সামনে অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা ২–৩ জন দুর্বৃত্ত মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনার পরপরই হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলির শব্দে আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণের জন্য ওই এলাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

গুলিবিদ্ধ মুসাব্বিরকে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিক উদ্ধার করে নিকটবর্তী একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তার শরীরের বক্ষ, উদর ও বাহুতে একাধিক গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ফজলুল করিম ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলেন, গুলির ঘটনায় দুইজন আহত হন। তাদের মধ্যে আজিজুর রহমান মুসাব্বির হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান। অপর গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির চিকিৎসা চলছে, তবে তার পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে।

মুসাব্বিরের রাজনৈতিক পরিচয় এবং পটভূমি
আজিজুর রহমান মুসাব্বির দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০১০–এর পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন আন্দোলন–সংগ্রাম, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও সামাজিক কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো পদে ছিলেন না, তবে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তার সক্রিয় যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বজায় ছিল।

ফার্মগেট এলাকা: অপরাধপ্রবণতা ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট
ফার্মগেট রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক, পরিবহন ও আবাসিক–মিশ্র অঞ্চল। কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হোটেল–রেস্তোরাঁ ও পরিবহন হাব ঘিরে সার্বক্ষণিক মানুষের উপস্থিতি থাকে। ব্যস্ততার কারণে এলাকাটিতে ছিনতাই, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং–তৎপরতা ও মাঝে–মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার–সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য অতীতে আইনশৃঙ্খলা সংস্থার নথিতে উঠে এসেছে। তবে এত জনবহুল স্থানে লক্ষ্যভেদী গুলির ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে, ফলে এ হত্যাকাণ্ডকে পুলিশ ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’ (লক্ষ্যনির্দিষ্ট হামলা) হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করছে।

তদন্ত কার্যক্রম ও সম্ভাব্য আলামত
ঘটনার পর ডিএমপির অপরাধ তদন্ত বিভাগ, তেজগাঁও থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডির একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং সম্ভাব্য ডিজিটাল আলামত (মোবাইল কল ডিটেইলস, লোকেশন ডাটা) বিশ্লেষণের কাজ চলছে। ঘটনাস্থল থেকে ৫টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে, যা ব্যালিস্টিক পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন, উৎস, পূর্ববর্তী অপরাধে একই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল কি–না এবং হামলার প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রাজধানীতে আগ্নেয়াস্ত্র–সংক্রান্ত হত্যার প্রবণতা: সাম্প্রতিক চিত্র
ঢাকায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সাধারণত তিনটি প্রধান ধারায় দেখা যায়—(১) পূর্বশত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিরোধ, (২) রাজনৈতিক বা আধিপত্য–সংক্রান্ত সংঘাত, (৩) অপরাধী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত প্রতিশোধ। ২০১৮–২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজধানীতে গুলি–সম্পর্কিত হত্যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ববিরোধ, আধিপত্য–সংক্রান্ত সংঘাত ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। লক্ষ্যনির্দিষ্ট হামলায় মোটরসাইকেল ব্যবহার, দ্রুত ‘হিট–অ্যান্ড–রান’ কৌশল, একাধিক গুলি ছোড়া এবং পরিচয় গোপন করে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধ বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত।

সম্ভাব্য প্রভাব ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন
এ ধরনের লক্ষ্যনির্দিষ্ট গুলির ঘটনা জনবহুল স্থানে ঘটায় স্থানীয় জননিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন, আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা, অপরাধী চক্রের সংঘবদ্ধ কাঠামো, রাজনৈতিক–সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ফরেনসিক–ডিজিটাল আলামত–ভিত্তিক তদন্ত সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপরাধীদের দ্রুত কৌশল পরিবর্তনের প্রবণতা—এসব কারণে রাজধানীতে আগ্নেয়াস্ত্র–সংক্রান্ত অপরাধ দমনে সমন্বিত নজরদারি, প্রযুক্তি–সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য–নির্ভর আগাম প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

মামলা প্রক্রিয়া
ঘটনার পর তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। নিহতের পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য শত্রুতা, বিরোধ বা পূর্বহুমকি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মামলার এজাহারে হত্যার সময়, স্থান, গুলির সংখ্যা, উদ্ধারকৃত আলামত, হাসপাতালের মৃত্যুসনদ এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য সংযুক্ত করা হবে বলে থানা সূত্র জানিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন, হামলার উদ্দেশ্য বা অপরাধী চক্রের পরিচয় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হবে না। তবে সিসিটিভি ও ফরেনসিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ শেষ হলে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

রাজধানী শীর্ষ সংবাদ