নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল খালেক

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল খালেক

রাজনীতি ডেস্ক

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিকে সমর্থন জানিয়ে আসনটি তাঁর জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেক শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব বিস্তারকারী এই নেতা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালে আসনটির প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (তারিখ: ৭ জানুয়ারি, ২০২৬) বিকাল ৩টায় ঢাকায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন আব্দুল খালেক। বৈঠকে উপস্থিত থাকার বিষয়টি খালেক নিজেও নিশ্চিত করেছেন। বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বৈঠকে মূলত দলীয় ঐক্য, নির্বাচনী পরিবেশ, স্থানীয় নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং জোটগত কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।

আসনটিতে বর্তমানে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—গণসংহতি আন্দোলনের মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, জামায়াতে ইসলামীর মো. মহসীন, এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি ও বিএনপি নেতা মো. সাইদুজ্জামান কামাল। এ ছাড়া আরও ৭ জন বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এই আসনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী না থাকলেও শুরুতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে খালেককে ঘিরে স্থানীয়ভাবে বিএনপিপন্থী ভোটের একটি বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

এর আগে দলীয় সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা পদ থেকে আব্দুল খালেক এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহসভাপতির পদ থেকে মেহেদী হাসান (পলাশ)–কে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি ছিল সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া মেহেদী হাসানের প্রার্থিতা যাচাই–বাছাইয়ে বাতিল হয়ে যায়, কারণ তাঁর দাখিল করা ১ শতাংশ ভোটার তালিকায় তথ্যগত ত্রুটি পাওয়া যায়। মনোনয়ন বাতিলের পর মেহেদী হাসান প্রকাশ্যে আব্দুল খালেককে সমর্থন জানান, যা আসনটিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলীয় বহিষ্কার ও মনোনয়ন বাতিলের ঘটনাগুলো সাংগঠনিকভাবে নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা আসার পর দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধভাবে জোটগত কৌশল অনুসরণ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দলের একাংশ শুরুতে খালেকের প্রতি সমর্থন দেখালেও এখন তাঁরা কেন্দ্রের নির্দেশ মেনে জোনায়েদ সাকিকে সহযোগিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেক বলেন, “চেয়ারপারসন আমাকে ডেকেছিলেন। আমি দলের সঙ্গে ২৫ বছর ধরে আছি, একবার সংসদ সদস্যও ছিলাম। স্থানীয় মানুষের মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আমি তাঁকে জানিয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছেন, সবাই একসঙ্গে কাজ করলে নির্বাচন ভালো হবে। না হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। তিনি সহযোগিতা কামনা করেছেন এবং আমাকে সম্মানজনক একটি সাংগঠনিক দায়িত্বে রাখার কথাও জানিয়েছেন।”

খালেক আরও জানান, “আমি এলাকায় যাচ্ছি। নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলব। দলীয় ঐক্য ধরে রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশ মানতে হবে—এটাই সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত।” তাঁর বক্তব্যে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত মানার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় নেতৃত্বকেন্দ্রিক প্রভাব, জোটগত হিসাব এবং সাংগঠনিক শক্তির ভিত্তিতে আলোচিত একটি আসন। এখানে বিএনপি আসনটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভোটের মাঠে জোটগত সমর্থনের প্রভাব বাড়বে। বিশেষত, বিএনপির সাংগঠনিক ভোটব্যাংক, জামায়াতের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী এবং অন্যান্য প্রার্থীদের অবস্থানের কারণে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও দৃশ্যমান হবে।

এ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী সাকি বিএনপির সমর্থন পাওয়ায় ভোটের মাঠে একটি বড় অংশের মনোযোগ তাঁর দিকে থাকবে, যদিও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মহসীনও স্থানীয়ভাবে সংগঠিত শক্তি ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে বিএনপি নেতা কামালসহ বাকি প্রার্থীরা ভোট বিভাজনে প্রভাব ফেলতে পারেন। ফলে নির্বাচনটি কৌশলগত জোট–সমর্থন, সাংগঠনিক ঐক্য, স্থানীয় জনমত এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলীয় ভোটের প্রবণতা, ভোটার উপস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাস এবং প্রশাসনিক তৎপরতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে এবারের নির্বাচনী পরিবেশ সাংগঠনিক ঐক্য ও জোটগত সমর্থনের ওপর নির্ভর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচন থেকে খালেকের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে স্থানীয় বিএনপিপন্থী ভোটের একটি বড় অংশ এখন জোট–সমর্থিত প্রার্থী সাকির দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসনিক পর্যায় থেকে এই আসন নিয়ে কোনো বিশেষ নির্দেশনা বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা–সংক্রান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে বহিষ্কার, মনোনয়ন বাতিল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থী কতটুকু সাংগঠনিক সমর্থন ও ভোটার আস্থা অর্জন করতে পারেন, সেটিই এ আসনের নির্বাচনী ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ