শিক্ষা ডেস্ক
ঢাকা, ৯ জানুয়ারি ২০২৬: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ–২০২৫ এর লিখিত পরীক্ষা আজ শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দেশের ৬১ জেলায় একযোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—বাদে দেশের সব জেলায় একই সময়সূচি অনুযায়ী এ পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার প্রার্থী, যা দেশের সরকারি চাকরি নিয়োগ পরীক্ষার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সূত্রে জানা গেছে, আজ বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ৯০ মিনিটের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক সময় শুরু হওয়ার আগেই প্রার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ নিশ্চিত করতে কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষার্থীদের দুপুর ২টার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হয়। ২টা ৩০ মিনিটের পর কেন্দ্রের সব গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং নির্ধারিত সময়ের পর আর কাউকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
দেশব্যাপী পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের ২০০ গজ ব্যাসার্ধ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, যাতে জনসমাগম, মিছিল, উচ্চস্বরে কথা বলা, অননুমোদিত জটলা ও সন্দেহজনক গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। পরীক্ষার সার্বিক তদারকি, কেন্দ্রে প্রবেশ ব্যবস্থাপনা, তল্লাশি ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করে।
ডিপিই’র জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, স্মার্টওয়াচ, যেকোনো ধরনের ডিজিটাল ঘড়ি, সাধারণ হাতঘড়ি, ব্লুটুথ ডিভাইস, ইয়ারফোন, পাওয়ার ব্যাংক, পার্স, মানিব্যাগ, ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড, কলম ছাড়া অন্য যেকোনো লেখনী, ব্যাগ, বই, নোট, কাগজ বা ইলেকট্রনিক সামগ্রী বহন নিষিদ্ধ ছিল। নির্দেশনা লঙ্ঘনের দায়ে এসব সামগ্রীসহ কাউকে পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আগেই জানানো হয়। পরীক্ষা শুরুর আগে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীদের তল্লাশি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। ডিজিটাল প্রতারণা ও অসদুপায় ঠেকাতে তল্লাশির সময় প্রয়োজনে টর্চলাইট ব্যবহার করে কান পরীক্ষা করার কথাও নির্দেশনায় উল্লেখ ছিল, যাতে কানে গোপন ব্লুটুথ বা মাইক্রো ডিভাইস ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করা যায়।
পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থীদের রঙিন প্রিন্ট করা প্রবেশপত্র এবং মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। এনআইডি ছাড়া অনলাইন কপি, ফটোকপি বা ডিজিটাল কপি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। পরীক্ষার হলে ওএমআর শিট পূরণের ক্ষেত্রে কেবল কালো কালির বলপয়েন্ট কলম ব্যবহার করতে বলা হয়। পেন্সিল, জেলপেন, সাইনপেন বা নীল/অন্য রঙের কলম ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় প্রার্থীদের প্রবেশপত্র ও এনআইডি মিলিয়ে দেখা হয় এবং প্রতিটি কক্ষে উপস্থিতি শিটে স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়।
এবারের পরীক্ষার মাধ্যমে সরকার ২০২৫ সালের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপ সম্পন্ন করছে। প্রথম ধাপে আবেদন গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হয় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। অধিদপ্তর জানায়, মোট শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার। এর মধ্যে সাধারণ কোটার পাশাপাশি নারী কোটা, পোষ্য কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা ও অন্যান্য সরকারি বিধি অনুযায়ী সংরক্ষিত কোটা অনুসরণ করে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হবে।
পরীক্ষা আয়োজনের আগে ডিপিই নিয়োগ সংক্রান্ত আর্থিক প্রতারণা বিষয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা প্রচার করে। নির্দেশনায় বলা হয়, নিয়োগের নামে কোনো ব্যক্তি, দালাল বা অননুমোদিত চক্রের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন, উপঢৌকন, চুক্তিভিত্তিক লেনদেন বা প্রতিশ্রুতিমূলক কোনো আর্থিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া যাবে না। অধিদপ্তরের মতে, শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে মেধা, লিখিত পরীক্ষার ফল, মৌখিক পরীক্ষার স্কোর, শিক্ষাগত যোগ্যতার যাচাই এবং সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হবে। এজন্য কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন বা তদবিরের সুযোগ নেই।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকেই প্রার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর ১২টার পর থেকেই প্রার্থীরা নিজ নিজ কেন্দ্রে ভিড় করতে শুরু করেন। ঢাকার ১৮০টি কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী অংশ নেন। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৪০টি, ময়মনসিংহে ৯৫টি, রাজশাহীতে ১১০টি, খুলনায় ১০০টি, বরিশালে ৭৫টি, সিলেটে ৮০টি এবং রংপুরে ৯০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে কেন্দ্রসচিব, সহকারী কেন্দ্রসচিব, কক্ষ পরিদর্শক, পুলিশ, আনসার এবং ভলান্টিয়ার দায়িত্ব পালন করেন।
ওএমআর-ভিত্তিক এ লিখিত পরীক্ষায় মোট ৮০ নম্বরের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং প্রাথমিক শিক্ষার ধারণা থেকে প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ ও সরবরাহে গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা প্রিন্টিং প্রেস ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষার হলে প্রবেশের পর প্রশ্নপত্র সিলগালা অবস্থায় কক্ষ পরিদর্শকদের উপস্থিতিতে খোলা হয়।
ডিপিই সূত্রে আরও জানা গেছে, লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হবে পরীক্ষার ৩০ দিনের মধ্যে। ফলাফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ প্রার্থীদের জেলা-ভিত্তিক মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হবে। মৌখিক পরীক্ষায় ২০ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। চূড়ান্ত মেধাতালিকা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সম্মিলিত স্কোর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার যাচাইয়ের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হবে। এরপর পুলিশ ভেরিফিকেশন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে নিয়োগপত্র প্রদান করা হবে।
এবারের পরীক্ষার বিশাল পরিসর, প্রযুক্তিগত প্রতারণা ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা, ১৪৪ ধারা জারি, কেন্দ্র-ভিত্তিক সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ওএমআর-নির্ভর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন পদ্ধতি—সব মিলিয়ে নিয়োগ পরীক্ষাটি জাতীয় মানদণ্ড অনুসারে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার প্রয়াস লক্ষ করা গেছে।


