আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার অনুসৃত আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন মানার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে জোরপূর্বক আটক করার প্রেক্ষাপটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, তার কর্মকাণ্ডের সীমা নির্ধারণ করবে মূলত তার নিজস্ব নৈতিক বোধ। আন্তর্জাতিক আইন মানা বা না মানার বিষয়টি তার নিজস্ব সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, মানুষের ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য তার নেই, তবে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কাঠামোকে তিনি বাধ্যতামূলক মনে করেন না। এই বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ও হস্তক্ষেপমূলক নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আলোচনা জোরদার হয়েছে।
গত শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায়। দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। অভিযানের একপর্যায়ে মার্কিন সেনারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয় এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামরিক পদক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ সেই নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে এই ঘটনার আইনি বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে এবং দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে তেলসম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেবে। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস জানায়, তারা ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের সঙ্গে সহযোগিতার কথা ভাবছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করবে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা অনুসরণ না করা হলে ভবিষ্যতে আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার বাইরে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রচেষ্টাও নতুন করে জোরালো হয়েছে। এসব উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে সম্প্রসারণবাদী প্রবণতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যেও ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গত জুন মাসে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের কয়েকটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেয়। সেই সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের এসব অবস্থান ও কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক মার্গারেট স্যাটারথওয়েট সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তার মতে, এ ধরনের প্রবণতা বিশ্বকে আবার শক্তিধর রাষ্ট্রনির্ভর রাজনীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে বলপ্রয়োগই হয়ে উঠবে সিদ্ধান্তের প্রধান মাধ্যম। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আগ্রাসী নীতি অনুসরণের প্রবণতা বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।


