জাতীয় ডেস্ক
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘন কুয়াশার মধ্যে রানওয়ের ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) ক্যাটাগরি-২ কার্যক্রমে ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে, যার ফলে বিমান চলাচলে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে এবং যাত্রী ও এয়ারলাইনস উভয়েরই অতিরিক্ত চাপ বাড়ছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আইএলএস কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৮টি ফ্লাইট ডাইভার্ট করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো আইএলএস ক্যাটাগরি-৩ ব্যবহার করলেও শাহজালাল বিমানবন্দর বর্তমানে ক্যাটাগরি-২ সুবিধা বজায় রাখতে পারছে না।
বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২৯ অক্টোবর অবতরণের সময় থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমান দুর্ঘটনাবশত হাই অ্যান্টেনা অ্যাপ্রোচ লাইট ভেঙে ফেলে। আইএলএস ক্যাটাগরি-২ বজায় রাখতে রানওয়ের কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ অ্যাপ্রোচ লাইট কার্যকর থাকতে হয়। বর্তমানে সাপ্লিমেন্ট অ্যাপ্রোচ লাইট সংখ্যা ৭৯ থেকে ৮৬টির মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং রানওয়ের ভিজিবিলিটি রেঞ্জ ৭০০ মিটার। বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে ক্যাটাগরি-২ থেকে ক্যাটাগরি-১-এ নেমে আসা প্রয়োজনীয় হয়েছে এবং পুনরায় ক্যাটাগরি-২-এ ফিরে আসতে আনুমানিক তিন মাস সময় লাগবে।
আইএলএস ক্যাটাগরি-২ পরিচালনার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, আইএলএসের যন্ত্রপাতি ক্যাটাগরি-২ মানসম্পন্ন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, রানওয়ের সব লাইটিং সিস্টেম—অ্যাপ্রোচ লাইট, সেন্টারলাইন লাইট ও এজ লাইটসহ—কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ কার্যকর থাকতে হবে। তৃতীয়ত, আবহাওয়াসংক্রান্ত যন্ত্রপাতি নির্ভুলভাবে কাজ করতে হবে। বর্তমান অবস্থায় দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
শীতকাল এলেই শাহজালাল বিমানবন্দরে ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়। এই শীতেও সেক্ষেত্রে বিমানবন্দর নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণের জন্য নির্ধারিত মানের ভিজিবিলিটি হারাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত দুসপ্তাহে অন্তত অর্ধশত ফ্লাইট কলকাতা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ডাইভার্ট হয়েছে। এ কারণে এয়ারলাইনসের অপারেশনাল সময়সূচি বিঘ্নিত হচ্ছে এবং যাত্রীদের মধ্যে ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
আইএলএস হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও পাইলটরা নিরাপদে বিমান অবতরণ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) আইএলএসকে ক্যাটাগরি-১, ২ ও ৩-এ ভাগ করেছে। ক্যাটাগরি-১ ব্যবস্থায় ন্যূনতম ১০০০ মিটার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন। ক্যাটাগরি-২ সুবিধায় ৫০০–৭৫০ মিটার দৃশ্যমানতাতেও নিরাপদ অবতরণ সম্ভব, আর ক্যাটাগরি-৩ থাকলে প্রায় শূন্য দৃশ্যমানতাতেও ফ্লাইট নিরাপদে অবতরণ করতে পারে।
বেসরকারি এয়ারলাইনসের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ঘন কুয়াশায় পাইলটরা যথাযথভাবে রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন না, ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট বা কলকাতায় ফ্লাইট ডাইভার্ট হচ্ছে। এতে শিডিউল ভেঙে যাচ্ছে এবং যাত্রী ও এয়ারলাইনস উভয়ের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দ্রুত লাইট পুনঃস্থাপন করে আইএলএস ক্যাটাগরি-২-এ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ কাউসার মাহমুদ জানান, লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আইএলএস ক্যাটাগরি-২ থেকে ১-এ অবনমন করা হয়েছে। এসব লাইট বিদেশ থেকে আনা হয় এবং ব্যয়বহুল। টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং দ্রুত পুনঃস্থাপন করা হবে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ক্যাটাগরি-২ বজায় রাখতে প্রতিদিন মনিটরিং, রক্ষণাবেক্ষণ ও দ্রুত ত্রুটি সমাধান জরুরি। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই লাইটিং সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও সংস্কার সম্পন্ন হলে এই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি এড়ানো যেত।
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল আইএলএস ক্যাটাগরি-১ সুবিধার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, যার প্রভাবে শীতকালীন ঘন কুয়াশায় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলোর নিরাপদ অবতরণ ও শিডিউল নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।


