ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা

ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে দেশজুড়ে চলমান গণবিক্ষোভ ক্রমেই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। চলমান সহিংসতায় এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও বিস্তৃত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মার্কিন প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানে পরিস্থিতির সর্বশেষ অগ্রগতি ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা, সাইবার কার্যক্রম জোরদার করা এবং সামরিক বিকল্প—এই তিনটি দিকই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পর্যায়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, সামরিক পদক্ষেপের আগে আরও সময় নিয়ে প্রস্তুতি প্রয়োজন। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সেনা মোতায়েন, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোরদার এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, সামরিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং এর ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশার বিপরীত হতে পারে।

ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে যে, বাহ্যিক হামলার আশঙ্কা ইরানের অভ্যন্তরে সরকারপন্থী শক্তিকে আরও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। পাশাপাশি, পুরো পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এসব কারণে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও প্রশাসনের ভেতরে ভিন্নমত প্রকাশ পাচ্ছে।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানে মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়ন, বেকারত্ব এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও বিস্তৃত হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত কঠোরতা প্রদর্শন না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তেহরান এসব বক্তব্যকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একাধিক আইনপ্রণেতাও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, সামরিক হামলা পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। কয়েকজন সিনেটর প্রকাশ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়ে বলেছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগই যে সর্বোত্তম সমাধান—তা নিশ্চিত নয়।

এদিকে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং অন্তত ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত থাকায় দেশটির ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

রোববার রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করছে। তিনি বলেন, প্রশাসনের হাতে “কঠোর বিকল্প” রয়েছে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ওয়াশিংটনকে ‘ভুল হিসাব’ না করার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানে কোনো হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটি ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটি ইরানের অন্যতম বড় গণআন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার পেছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকার অভিযোগ তুলেছে এবং এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে সমাবেশের আহ্বান জানিয়েছে। আঞ্চলিকভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কায় প্রতিবেশী দেশগুলোও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো পশ্চিম এশিয়ার জন্য একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ