আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে এবং তা দেশটির প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে চলমান এই বিক্ষোভ ঘিরে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যেমন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক উত্তেজনাও নতুন করে সামনে এসেছে। ইরান সরকার অভিযোগ করেছে, এই বিক্ষোভে বিদেশি শক্তির উসকানি ও মদত রয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিক্ষোভের একটি অংশ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সীমা অতিক্রম করে সরকারি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলায় জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের দাবি, বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লক্ষ্য করে ভাঙচুর চালিয়েছে এবং একাধিক ধর্মীয় ও জরুরি সেবামূলক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করেছে। এসব ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৫৩টি মসজিদে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং ১৮০টি অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইরানি সমাজের স্বাভাবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এগুলো দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সরকার এই সহিংসতার পেছনে বিদেশি উসকানির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তেহরানের আবুজার মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের একটি ঘটনার ভিডিও ফুটেজ নিরাপত্তা সংস্থার হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তি মসজিদের ভেতরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং ধর্মীয় বইপত্র ছড়িয়ে দেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ৯ জানুয়ারি ওই মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছে।
বিক্ষোভ ও সহিংসতার অভিযোগের পাশাপাশি ইরানে সরকারপন্থী সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার দেশটির বিভিন্ন প্রধান শহরে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারের প্রতি সমর্থন জানান। এসব সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করে স্লোগান দেন। সরকার সমর্থক এই কর্মসূচিগুলোকে দেশের স্থিতিশীলতার পক্ষে জনমতের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর বক্তব্য এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা হলে তা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন। এর জবাবে ইরান সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে তারা আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
তবে প্রকাশ্য উত্তেজনার মধ্যেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রয়োজনের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল খোলা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ বজায় আছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, চলমান বিক্ষোভ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক চাপ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন কোন পথে অগ্রসর হবে এবং সরকার কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


