আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের নিকটবর্তী এলাকায় দেশটির সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানের ওপর বিমান হামলা জোরদার করেছে। একই সময়ে স্থলভাগে আরাকান আর্মি এবং তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের হোয়াইক্যং ও লম্বাবিলে বোমা বিস্ফোরণ ও মর্টার শেলের কারণে ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠার ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার থেকে শনিবার পর্যন্ত এ এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাখাইন সীমান্তে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষ চলছিল। মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীও এ সময় আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা নিক্ষেপ করেছে। সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলি এপারে এসে পড়ায় টেকনাফের ঘরবাড়ি, চিংড়ি ঘের ও চাষের জমিতে ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার একপর্যায়ে স্থানীয় হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকার ৯ বছর বয়সী চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী হুজাইফা আফনান গুলিবিদ্ধ হন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, গুলি মেয়েটির মুখ দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে পৌঁছেছে এবং তার অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। আফনান উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের জসিম উদ্দিনের কন্যা এবং তেচ্ছিব্রিজ হাজি মো. হোছাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী।
টেকনাফ সীমান্তে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষ টেকনাফ-কক্সবাজার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আফনানের চাচা শিক্ষক আলী আকবর সাজ্জাদ জানান, সকাল ১০টার দিকে আফনান অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে উঠানে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানায়, সীমান্তে সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশে প্রবেশকালে ৫৩ জন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ ছিলেন। পরে এদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের ওপারে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং নাফ নদ ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম জানান, সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করার জন্য সতর্ক করা হচ্ছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, তিন দিনের বেশি সময় ধরে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণ চলেছে। এসময় শত শত রাউন্ড গুলি ও একাধিক বোমা বিস্ফোরণে এপারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। ছোড়া গুলি স্থানীয় চাষের জমি, চিংড়ি ঘের এবং ঘরবাড়িতে আঘাত করছে।
স্থানীয়রা আরও জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত হোয়াইক্যং সীমান্তের খুব কাছে রাখাইনে সংঘর্ষ চলায় এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠেছে। একাধিক বাড়িতে এবং বেড়িবাঁধে গুলির ছাপ দেখা গেছে। স্থানীয় রমজান উদ্দিন বলেন, সকালে বেড়িবাঁধে গিয়ে তিনি বেশ কিছু গুলি দেখতে পান, যা সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির অংশ ছিল।
সীমান্তের নিরাপত্তা এবং সাধারণ জনজীবন অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করেছে।


