আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও উত্তরা পশ্চিম থানাধীন এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে টেলিগ্রামভিত্তিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে পাঁচজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। অভিযানে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ৫১ হাজার ২৫১টি সিম, ৫১টি মোবাইল ফোন এবং ২১টি ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস রয়েছে।
শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা সংঘবদ্ধভাবে অনলাইন যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন চেন লিং ফেং, জেং কং, জেং চাংকিয়াং, ওয়েন জিয়ান কিউ, হুয়াং ঝেং জিয়াং, মো. জাকারিয়া (২৬), নিয়াজ মাসুম (২০) এবং কামরুল হাসান ওরফে হাসান জয় (৩৮)। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রে দেশি ও বিদেশি নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
ডিবির তথ্যমতে, প্রতারক চক্রটি কখনো চাকরি দেওয়ার আশ্বাস, কখনো বেশি মুনাফার বিনিয়োগ প্রস্তাব, আবার কখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহের বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিত। এসব প্রতারণায় মূল যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হতো। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের সময় তারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করত এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ও পরিচয় গোপন রাখত।
উপ-পুলিশ কমিশনার জানান, ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের ওয়েবভিত্তিক অপরাধ তদন্ত টিম অনলাইন জব প্রতারণা, টেলিগ্রাম গ্রুপভিত্তিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে রাজধানীতে সক্রিয় একাধিক প্রতারক চক্রের অস্তিত্ব শনাক্ত করে। প্রাপ্ত অভিযোগ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথমে ভাটারা থানার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অভিযান চালানো হয়। গত বৃহস্পতিবার ওই অভিযানে নিয়াজ মাসুম ও কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওই সময় তাদের হেফাজত থেকে অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৪টি ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস, বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ৫১ হাজার ৬৭টি সিম, চারটি মোবাইল ফোন, দুটি সিপিইউ এবং একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সম্প্রসারণ করা হলে রাজধানীর আরও কিছু এলাকায় একই ধরনের প্রতারণা চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৯ নম্বর সেক্টরে আরেকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানে পাঁচজন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে সাতটি অবৈধ ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৪৭টি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন অপারেটরের ১৮৪টি সিম এবং পাঁচটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস ও বিপুল সংখ্যক সিম ব্যবহার করে দেশি ও বিদেশি নম্বরে কল রুটিং এবং অনলাইন প্রতারণামূলক যোগাযোগ পরিচালনা করা হতো। এসব ডিভাইসের মাধ্যমে প্রতারকরা নিজেদের প্রকৃত পরিচয় ও অবস্থান গোপন রেখে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করত বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা পাওয়া গেছে। এতে করে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে উপ-পুলিশ কমিশনার সাধারণ জনগণকে অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবা ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞাতসারে নিজের অ্যাকাউন্ট অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়ার কারণে মানুষ আইনি জটিলতায় পড়ছে, যা পরবর্তীতে ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
বায়োমেট্রিক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও এত বিপুল সংখ্যক সিম কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। উদ্ধার করা সিমগুলো বৈধভাবে নিবন্ধিত কি না এবং কোন প্রক্রিয়ায় এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে, তা বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
ডিবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।


